ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্য: আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?

Fake Doctor September 16, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
ভুয়া ডাক্তারদের দৌরাত্ম্য: আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?

চিকিৎসা এমন একটি পেশা যেখানে একজন মানুষ তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ "জীবন" অন্য একজনের জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর বিশ্বাস করে তুলে দেন।

তাই কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-শিক্ষা ও বৈধ নিবন্ধন ছাড়াই নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে রোগী দেখলে সেটি শুধু প্রতারণা নয়। এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি।

সম্প্রতি যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দেশে বিপুলসংখ্যক ভুয়া চিকিৎসকের অস্তিত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রতিবেদন যদি সঠিক হয় তাহলে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন প্রতারণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই কারন এটি একটি গুরুতর regulatory ও public health concern।

আইন কি নেই?

আছে এবং যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আইনও আছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুযায়ী BMDC-তে নিবন্ধন ছাড়া কেউ নিজেকে নিবন্ধিত মেডিকেল বা ডেন্টাল চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করলে তা অপরাধ। আইনের ২৮ ধারার অধীনে এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই আইনের ২৯ ধারায় নির্দিষ্ট যোগ্যতা ছাড়া ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহারের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে। 

এমনকি BMDC-এর অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে নিবন্ধিত নন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং চিকিৎসা বিষয়ে ভুয়া পদবি, ডিগ্রি ও প্রতারণামূলক পরিচয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অন্তর্ভুক্ত। 

তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক:

আইন আছে তাহলে ভুয়া ডাক্তারদের এত দৌরাত্ম্য কেন?

সমস্যা সম্ভবত শুধু আইনের অভাব নয়। বড় সমস্যা হলো নজরদারি, শনাক্তকরণ, enforcement এবং ধারাবাহিক prosecution-এর ঘাটতি।

একজন ভুয়া ডাক্তার শুধু ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছেন না। তিনি ভুল রোগ নির্ণয় করতে পারেন, ভুল ওষুধ দিতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করতে পারেন কিংবা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।

অর্থাৎ একজন ভুয়া ডাক্তার প্রতারণার পাশাপাশি সম্ভাব্য জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করেন।

উন্নত দেশগুলো কীভাবে দেখে?

যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা পেশা কঠোরভাবে regulated। Medical Act 1983-এর Section 49 অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসক হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দেওয়া বা এমন title ব্যবহার করা অপরাধ। 

অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবস্থা আরও কাঠামোবদ্ধ। সেখানে registration status-এর একটি public register রয়েছে। কেউ নিবন্ধিত না হয়েও নিজেকে registered health practitioner হিসেবে উপস্থাপন করলে সেটি criminal offence। ২০২৫ সালে এমন এক ব্যক্তিকে registered medical practitioner হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য A$12,500 জরিমানা এবং legal costs দিতে হয়েছে। 

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ভুয়া চিকিৎসক নয়, যে প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে এমন ব্যক্তিকে registered practitioner হিসেবে উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। 

বাংলাদেশে কী করা জরুরি?

আমার মতে, এখন শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর regulatory system।

প্রথমত, BMDC-এর public register আরও সহজ ও শক্তিশালী করতে হবে। রোগী মোবাইল ফোনে নাম বা registration number দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে চিকিৎসকের পরিচয় যাচাই করতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে প্রত্যেক চিকিৎসকের BMDC registration যাচাই করে নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, ভুয়া সনদ, ভুয়া পদবি বা মিথ্যা পরিচয় ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয় বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে ভুয়া ডাক্তারকে রোগী দেখানোর সুযোগ দেয় তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নিয়মিত inspection ও monitoring চালাতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু বড় শহরে সীমাবদ্ধ নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

একজন ভুয়া আইনজীবী ভুল পরামর্শ দিলে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একজন ভুয়া প্রকৌশলী ভুল কাজ করলে সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিন্তু একজন ভুয়া ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করলে একজন মানুষের জীবন চলে যেতে পারে।

তাই ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক অভিযান নয়। এটি মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রের regulatory credibility রক্ষার দায়িত্ব।

আইন আমাদের আছে। এখন প্রয়োজন আইনের দৃশ্যমান, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

ডাক্তার হওয়ার জন্য শুধু সাদা অ্যাপ্রন যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন স্বীকৃত চিকিৎসা-শিক্ষা, বৈধ নিবন্ধন, দক্ষতা এবং জবাবদিহি।

আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে একজন সাধারণ মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে সহজেই নিশ্চিত হতে পারেন—

“আমি যার হাতে আমার জীবন তুলে দিচ্ছি, তিনি সত্যিই একজন বৈধ ও যোগ্য চিকিৎসক কি না"।

Barrister Md Sohrawardy Saddam 

Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU), 

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University (LSBU), UK.

Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!