রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান, এই কথাটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা গণতন্ত্রের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যরাতে হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায় এবং পরে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকার মধ্যেই তাঁর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর এসেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য এর শিক্ষা কী—সেটি।
যদি কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। বরং তদন্ত হতে হবে স্বাধীনভাবে, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং একই মানদণ্ডে।
পদত্যাগের নির্দেশকে তাই শুধু একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এমন একটি বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে যে জনপ্রতিনিধির পদ কোনো ব্যক্তিকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখে না।
তবে এখানে একটি ভারসাম্যও জরুরি।
রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং ফৌজদারি দায় এক বিষয় নয়।
কোনো ব্যক্তিকে পদত্যাগ করতে বলা বা দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু তিনি অপরাধ করেছেন কি না, সেটি নির্ধারণ করবে আইনগত তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া। অভিযোগ এবং প্রমাণকে এক করে দেখা উচিত নয়।
গণতন্ত্রে একজন এমপির ক্ষমতা আসলে একটি জনসেবা ও জনআস্থার দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের সঙ্গে যদি হামলা, লুটপাট, দখল বা ভাঙচুরের মতো গুরুতর অভিযোগ যুক্ত হয়, তাহলে তদন্তের মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনের মৌলিক নীতিও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে:
“ক্ষমতাবানদের কি সত্যিই জবাবদিহি করতে হয়?”
এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, বাস্তব ঘটনায় দিতে হবে।
যে ব্যক্তি অপরাধ করবে, সে যে দলেরই হোক বা যে পদেই থাকুক, আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে যেমন তদন্ত হয়, একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া থাকা উচিত। বরং জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত জবাবদিহি আরও বেশি, কারণ তাঁর হাতে জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব থাকে।
রাড্ডা ঘটনার ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তিনটি বিষয় হলো—
স্বচ্ছ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি।
কাউকে রাজনৈতিক কারণে ছাড় দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কত কঠোর আইন আছে তার ওপর নির্ভর করে না। শক্তি নির্ভর করে আইনটি কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং কার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে না, তার ওপর।
যদি এই ঘটনায় সত্যিই প্রমাণিত হয় যে কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা তাঁর সহযোগীরা আইন ভেঙেছেন, তাহলে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন শাস্তি এড়ানোর ঢাল না হয়।
আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলেও সেই সত্য প্রকাশ্যে আসতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হওয়া উচিত—
পদ মানুষকে ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না।
এটাই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক জবাবদিহির মূলনীতি।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com