আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা ৩৫ বছর: পেশার মানোন্নয়ন নাকি মেধা ও অভিজ্ঞতার পথে বাধা?

Age Limit for Entry into the Legal Profession October 14, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা ৩৫ বছর: পেশার মানোন্নয়ন নাকি মেধা ও অভিজ্ঞতার পথে বাধা?

বাংলাদেশে আইন পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ১৩ অক্টোবর ২০২৬ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা জানান। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তটি ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ।

এই উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি হলো, আইন পেশার মান, মর্যাদা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং অবসরের পর অন্য পেশা থেকে এসে আইনজীবী হওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন পেশার মানোন্নয়নের জন্য বয়সসীমা নির্ধারণই কি সবচেয়ে কার্যকর উপায়?

বয়সসীমার পক্ষে যুক্তি

আইন পেশা কেবল একটি সনদ অর্জনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত বিচারপ্রার্থীর অধিকার, ন্যায়বিচার, পেশাগত সততা এবং আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা। তাই আইনজীবী হিসেবে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

নির্দিষ্ট বয়সসীমার সমর্থকেরা মনে করেন, এতে তরুণ আইন স্নাতকদের পেশায় প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে এবং আইন পেশাকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবন হিসেবে গড়ে তোলার প্রবণতা উৎসাহিত হতে পারে। পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা অর্জন ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া সম্ভব।

তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে তা নির্ভর করবে আইনজীবী নিয়োগের মানদণ্ড, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত তদারকির ওপর। শুধু বয়স কম হলেই কেউ দক্ষ বা নৈতিক আইনজীবী হবেন এমন নিশ্চয়তা নেই।

বয়সসীমার সম্ভাব্য কুফল

প্রথমত, এটি পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। কেউ ৩৫ বছর বয়সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করলে বা অন্য পেশায় কাজ করার পর আইন পেশায় আসতে চাইলে তাঁর জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অভিজ্ঞতার মূল্য উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন, ব্যবসা, ব্যাংকিং, কর, পুলিশ কিংবা বিচার-সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আইন পেশায় এসে বিশেষ দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন। বয়সের কারণে তাঁদের সবাইকে বাদ দিলে পেশাটি সম্ভাব্য অভিজ্ঞ জনশক্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

তৃতীয়ত, বয়সকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি রয়েছে। একজন ২৮ বছর বয়সী ব্যক্তি যেমন অদক্ষ হতে পারেন, তেমনি ৪০ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি অত্যন্ত দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল আইনজীবী হতে পারেন। প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও পেশাগত যোগ্যতা।

উন্নত বিশ্বে কী দেখা যায়?

যুক্তরাজ্য: ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সলিসিটর বা ব্যারিস্টার হওয়ার যোগ্যতা মূলত শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন এবং উপযুক্ততা যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করে। Solicitors Regulation Authority-এর প্রকাশিত যোগ্যতার নিয়মে সাধারণভাবে ৩৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র: American Bar Association-এর তথ্য অনুযায়ী, আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত আইন বিষয়ে শিক্ষা, বার পরীক্ষা, পেশাগত নৈতিকতা ও চরিত্রগত উপযুক্ততা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যভেদে নিয়ম আলাদা হলেও আইনজীবী হওয়ার সর্বজনীন ৩৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা সাধারণ নিয়ম নয়। ।

এই উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যায়, পেশার মান বজায় রাখার একটি পথ হলো বয়সের পরিবর্তে যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও পেশাগত আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া। তবে বিদেশের ব্যবস্থা সরাসরি বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা যাবে না বরং  দেশের আইন, শিক্ষাব্যবস্থা ও পেশাগত কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাহলে বাংলাদেশের জন্য সমাধান কী?

আইন পেশার মানোন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তার জন্য আরও কার্যকর কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে:

  • বার কাউন্সিলের পরীক্ষাকে আরও মানসম্মত ও স্বচ্ছ করা।
  • আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির আগে বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা।
  • পেশাগত নৈতিকতা, মক্কেলের অর্থের সুরক্ষা এবং অসদাচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
  • বয়স নির্বিশেষে প্রত্যেক প্রার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত উপযুক্ততা যাচাই করা।
  • বয়সসীমা চালু করার আগে এর প্রয়োজনীয়তা, সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি, সম্ভাব্য প্রভাব এবং ব্যতিক্রমের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি ও কার্যকর বিধান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সংবাদে সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত হলেও চূড়ান্ত বিধি, এর আওতা এবং ইতিমধ্যে আইনশিক্ষা গ্রহণরত বা পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে তা আনুষ্ঠানিক নথি থেকে নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, আইন পেশার মর্যাদা রক্ষার জন্য মানদণ্ড কঠোর করা প্রয়োজন কিন্তু সেই মানদণ্ড যেন ন্যায়সংগত, যুক্তিসংগত এবং প্রকৃত যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

বয়স একটি প্রশাসনিক মানদণ্ড হতে পারে কিন্তু এটি একজন মানুষের আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি নয়। আইন পেশায় তরুণদের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দক্ষতাও কাজে লাগানোর সুযোগ থাকা উচিত।

আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হোক জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে, শুধু জন্মতারিখের ভিত্তিতে নয়।

কারণ, বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রয়োজন শুধু কম বয়সী আইনজীবী নয় বরং এমন আইনজীবী, যিনি আইন জানেন, ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে সক্ষম।

Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU),
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!