কুমিল্লার আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর কিশোরী তাজনিমের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের আবারও ভাবিয়ে তুলেছে। একটি সম্ভাবনাময় কিশোরীর এমন পরিণতি শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয় বরং আমাদের পারিবারিক সচেতনতা, সন্তান লালন-পালন, সামাজিক দায়িত্ব এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া তাজনিম বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কয়েক দিন বাড়িতে না ফেরার ঘটনা এবং তার পাঠানো মেসেজ সময়মতো দেখতে না পারার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব তথ্যের পূর্ণ সত্যতা ও ঘটনার দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত। তাই শোকাহত পরিবারকে দোষারোপ করা নয় বরং এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
সন্তানকে ভালোবাসা আর সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, দামি মোবাইল দেওয়া কিংবা তার সব আবদার পূরণ করাই অভিভাবকত্বের শেষ কথা নয়। বিশেষ করে কৈশোরে প্রবেশ করা সন্তানদের মানসিক পরিবর্তন, বন্ধুত্ব, অনলাইন যোগাযোগ, চলাফেরা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে মা-বাবার সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীনতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের স্বাধীনতার সঙ্গে বয়সোপযোগী দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক যোগাযোগের ভারসাম্যও থাকতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে থাকছে, কখন ফিরবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে যোগাযোগ করবে এসব বিষয়ে আগে থেকেই স্পষ্ট বোঝাপড়া থাকা দরকার।
উন্নত বিশ্বে শিশু সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার অভিজ্ঞতা দেখায় শিশু সুরক্ষা শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় নয় বরং এর সঙ্গে আইন, পুলিশ, স্কুল, সামাজিক সেবা এবং জনসচেতনতা জড়িত।
১. যুক্তরাজ্য: নিখোঁজ হলে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা নয়
যুক্তরাজ্যের সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে কাউকে নিখোঁজ মনে হলে পুলিশে জানাতে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। শিশু নিখোঁজ হলে বা তার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে দ্রুত রিপোর্ট করা যায়। তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। ।
এ ছাড়া ইংল্যান্ডে Working Together to Safeguard Children নির্দেশিকার মাধ্যমে পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবার মধ্যে শিশু সুরক্ষায় সমন্বয়ের কাঠামো রয়েছে। ।
২. যুক্তরাষ্ট্র: নিখোঁজ শিশুর বিষয়ে তাৎক্ষণিক রিপোর্ট
যুক্তরাষ্ট্রের National Center for Missing & Exploited Children (NCMEC) নির্দেশনা দেয় সন্তান নিখোঁজ বলে মনে হলে প্রথমেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। শিশুর ছবি, বয়স, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সর্বশেষ অবস্থান ও পরিচিত যোগাযোগের তথ্য তদন্তে সহায়তা করতে পারে। ।
৩. অস্ট্রেলিয়া: শিশু নির্যাতন ও অবহেলা রিপোর্ট করার ব্যবস্থা
অস্ট্রেলিয়ায় শিশু সুরক্ষার আইন রাজ্য ও টেরিটরি অনুযায়ী ভিন্ন। নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের শিশু নির্যাতন বা অবহেলার সন্দেহ রিপোর্ট করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্যও রিপোর্টিংয়ের বিধান প্রযোজ্য। ।
৪. কানাডা: শিশু সুরক্ষায় আইনগত রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের Child, Youth and Family Services Act, 2017-এর ১২৫ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো শিশু সুরক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে যুক্তিসংগত সন্দেহ হলে দ্রুত শিশু সুরক্ষা সংস্থাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শিশুদের নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকারীদের ক্ষেত্রে রিপোর্ট না করার জন্যও নির্দিষ্ট আইনি পরিণতি হতে পারে।
বাংলাদেশের আইনি অবস্থান কী?
বাংলাদেশেও শিশু সুরক্ষার জন্য আইন রয়েছে। তবে আইনে সুরক্ষার বিধান থাকা এবং বাস্তবে দ্রুত ও কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া এক বিষয় নয়।
১. শিশু আইন, ২০১৩
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের সুরক্ষা, কল্যাণ এবং সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। শিশু বিপদে পড়লে বা সুরক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার। আইনটির বাস্তব প্রয়োগ, শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
২. সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে। শিশুর জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
৩. দণ্ডবিধি ও অপরাধের দায়
কোনো শিশুকে অপহরণ, বেআইনিভাবে আটকে রাখা, যৌন নির্যাতন বা হত্যা করা হলে ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণ অনুযায়ী দণ্ডবিধি এবং প্রযোজ্য বিশেষ আইনে ফৌজদারি দায় নির্ধারিত হতে পারে। অপরাধের দায় ব্যক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
৪. অভিভাবকের দায়িত্ব ও আইনি সীমা
মা-বাবার দায়িত্ব সন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু সন্তান কোনো বিপদে পড়লেই মা-বাবাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগতভাবে দায়ী করা যায় না। অভিভাবকের অবহেলা, জ্ঞান, আচরণ এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্কের মতো বিষয় প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে।
অর্থাৎ, নৈতিক দায়িত্ব ও আইনগত দায় এক নয়। একজন অভিভাবকের আরও সচেতন হওয়া উচিত ছিল এমন মত প্রকাশ করা যেতে পারে কিন্তু যথাযথ প্রমাণ ছাড়া তাঁকে কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করা যায় না।
তাহলে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, সন্তানকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা, বন্ধুত্ব, অনলাইন পরিচয় বা বিপদের কথা মা-বাবাকে জানাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সন্তান কোথায় যাচ্ছে এবং কখন ফিরবে সে বিষয়ে বয়সোপযোগী নিয়ম থাকা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ফেরার পরও যোগাযোগ না হলে দ্রুত খোঁজ নিতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিখোঁজ হলে বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
তৃতীয়ত, স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ছবি ও অবস্থান প্রকাশের ঝুঁকি সম্পর্কে সন্তানকে শিক্ষা দিতে হবে। ফোন হাতে থাকাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।
চতুর্থত, স্কুল, পরিবার, পুলিশ এবং শিশু সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং ঝুঁকির মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ কোনো শিশুকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দেখলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে উৎসাহিত করতে হবে।
শেষ কথা: আবেগ নয় বরং দায়িত্বশীলতাই হোক আমাদের শিক্ষা
তাজনিমের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সন্তানকে ভালোবাসা, তার স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এই তিনটি দায়িত্বকে একসঙ্গে পালন করতে হয়।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে পারে তেমনি দায়িত্বশীল তদারকির অভাব তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজন আস্থা, সচেতনতা, যোগাযোগ এবং বয়সোপযোগী সুরক্ষার ভারসাম্য।
আমরা যেন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শোকাহত পরিবারকে আক্রমণ না করি যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে না দিই এবং তদন্তের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করি। বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি তুলি।
সন্তানের হাতে দামি ফোন তুলে দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকে নিরাপত্তাবোধ, সঠিক শিক্ষা এবং বিপদে সাহায্য চাওয়ার সাহস দেওয়া।
সন্তানকে স্বাধীনতা দিন কিন্তু দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন না। ভালোবাসুন, বিশ্বাস করুন, সচেতন থাকুন।
কারণ, প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার রক্ষা করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU),
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com