সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026। বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বাবা-মা সন্তান কে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা তাঁর জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। একই ধরনের ব্যবস্থা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
আইনটির পেছনে যে মানবিক বাস্তবতা রয়েছে সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের সমাজে এমন ঘটনাও কম নয় যেখানে বাবা-মা জীবনের সঞ্চয় বা বসতবাড়ি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর জীবনের শেষ বয়সে সেই সম্পত্তিতেই হয়ে পড়েন অনাহূত বা অসহায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি ইসলামী উত্তরাধিকার ও হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করছি?
কুরআন উত্তরাধিকারকে কীভাবে দেখেছে?
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি কার কতটুকু হবে, সেটি মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার বিষয় নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে:
হেবা (Gift) আর মিরাস (Inheritance) এক জিনিস নয়।
জীবদ্দশায় একজন ব্যক্তি তাঁর বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি অন্যকে হেবা করতে পারেন। অন্যদিকে তাঁর মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টিত হয়।
তাই “জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান” এবং “মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার”কে এক করে দেখা আইনগত ও ফিকাহগতভাবে সঠিক হবে না।
তাহলে কি জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান করা ইসলামে নিষিদ্ধ?
উত্তর হলো, না।
সাধারণভাবে একজন সুস্থ ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি হেবা করতে পারেন। তবে ইসলামী হেবার ক্ষেত্রে ইজাব, কবুল এবং ক্ববজা (possession) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে হানাফি ফিকাহে দাতা সম্পত্তির ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সেটিকে সম্পূর্ণ হেবা করে দিয়েছেন বলা হলে বিষয়টি জটিল হয়ে যায়।
আর এখানেই বর্তমান আইনের সঙ্গে ইসলামী হেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবিত/পাস হওয়া নতুন ব্যবস্থায় মালিকানা গ্রহীতার কাছে গেলেও দাতা তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করতে পারবেন। আইনটি এটিকে হেবা হিসেবে নয় বরং Transfer of Property Act-এর অধীনে একটি স্বতন্ত্র transfer mechanism হিসেবে বিবেচনা করছে। বিলের 122A-তে lifetime usufruct এবং 122B-তে এর variation/revocation-এর বিষয় রাখা হয়েছে।
আইনমন্ত্রীও সংসদে বলেছেন, এই নতুন পদ্ধতি মুসলিম আইনের হেবা নয় এবং এটি হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে কি সরাসরি সংঘাত হচ্ছে?
এখানে বিষয়টিকে সাদা-কালোভাবে দেখা ঠিক হবে না।
যারা বলছেন, “ইসলামে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি দেওয়া যায় না”, তাঁদের বক্তব্যও একটু সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এক-তৃতীয়াংশের বিধান মূলত ওসিয়তের (wasiyyah) সঙ্গে সম্পর্কিত।
সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁকে তাঁর সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করার অনুমতি দেন এবং বলেন, এক-তৃতীয়াংশও অনেক।
অতএব, “জীবিত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি হেবা করতে পারবেন না” এমন সরল বক্তব্য ফিকাহের পূর্ণাঙ্গ অবস্থানকে প্রকাশ করে না। সুস্থ অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুশয্যার ওসিয়ত এক বিষয় নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা বা নৈতিক দায়িত্ব নেই।
সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যমূলক হেবা সম্পর্কে রাসুল (সা:) এর শিক্ষা
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে।
নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর পিতা তাঁকে বিশেষ একটি উপহার দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা:) জিজ্ঞাসা করলেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই ধরনের উপহার দেওয়া হয়েছে? যখন উত্তর হলো “না”, তখন তিনি বলেন:
“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।”
এরপর তাঁর পিতা সেই উপহার ফিরিয়ে নেন।
এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়:
জীবদ্দশায় সম্পত্তি হেবা করার সুযোগ থাকলেও সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টি করা ইসলামের আদর্শ নয়।
অর্থাৎ সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শুধু “আমি মালিক, তাই যা খুশি করতে পারি” এই দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, পারিবারিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ বিরোধের বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
উত্তরাধিকারীর অধিকার কি এভাবে বাতিল করা যায়?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কুরআন উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:
“আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য ওসিয়ত নেই।”
তবে এর অর্থ এই নয় যে একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তির কোনো অংশই হস্তান্তর করতে পারবেন না। বরং বিষয়টি নির্ভর করবে কখন, কী উদ্দেশ্যে, কী পদ্ধতিতে এবং কোন অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর করা হচ্ছে তার ওপর।
বিশেষ করে মৃত্যুকে সামনে রেখে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে সম্পত্তি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা হলে সেটি শরিয়াহর ন্যায়বিচারের মূলনীতির সঙ্গে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক:
আমার দৃষ্টিতে এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হলো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা।
আমাদের দেশে অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের নামে বাড়ি-জমি লিখে দেওয়ার পর বাস্তবে নিজেরাই সেই সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান।
বাংলাদেশে এমনকি ইতোমধ্যে Parents Maintenance Act, 2013 রয়েছে, যার মাধ্যমে সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণের আইনগত দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে।
কিন্তু শুধু ভরণ-পোষণের আইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না।
একজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য নিজের মাথা গোঁজার জায়গা, পরিচিত বাড়ি এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নিরাপদে থাকার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় lifetime usufruct ব্যবস্থা বাস্তবিক অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়
আইনটির উদ্দেশ্য ভালো হলেও এর প্রয়োগে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, “মালিকানা” এবং “ভোগস্বত্ব” আলাদা হওয়ায় ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একজন দাতা যদি এক সন্তানকে সম্পত্তি দান করেন এবং অন্য সন্তানদের কিছু না দেন, তাহলে পারিবারিক বিরোধের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তি যদি মৃত্যুর অল্প আগে অসুস্থ অবস্থায় এমন হস্তান্তর করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে এটি প্রকৃত স্বেচ্ছাধীন transfer, নাকি ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
চতুর্থত, দাতা জীবিত থাকলেও গ্রহীতা মালিক হলে সে সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্যভাবে ব্যবহার করতে পারবে কি না এবং donor-এর lifetime usufruct কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেসব বিষয়ে পরিষ্কার প্রয়োগগত কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিলের 122B অনুযায়ী নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে এই ধরনের gift একতরফাভাবে বাতিল করা যাবে না, নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নিবন্ধিত দলিল অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে District Judge-এর অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে সমাধান কোথায়?
আমাদের বিতর্কটি হওয়া উচিত না—"কুরআন বনাম আইন”
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“কীভাবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং একই সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা যায়?”
বাবা-মাকে সন্তানদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেমন জরুরি তেমনি ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীদের অধিকারও অযৌক্তিকভাবে ক্ষুণ্ন না করা জরুরি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাই কয়েকটি safeguards বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. দাতার স্বেচ্ছাসম্মতি নিশ্চিত করা;
২. মানসিক সক্ষমতা যাচাই করা, বিশেষত গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়;
৩. সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যমূলক হস্তান্তর হলে তা নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা;
৪. donor-এর lifetime usufruct বাস্তবে যাতে কেউ লঙ্ঘন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা;
৫. প্রতারণা, undue influence বা জালিয়াতির অভিযোগের দ্রুত বিচার ব্যবস্থা করা; এবং
৬. মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে হেবা, ওসিয়ত ও উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট বিধান ও বিচারিক ব্যাখ্যা তৈরি করা।
পরিশেষে বলা যায়, বাবা-মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি আইনি দায়িত্ব নয় বরং এটি আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও।
কুরআন বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। আর রাসুলুল্লাহ (সা:) সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় প্রত্যেক বৈধ উত্তরাধিকারীর অধিকারও নির্ধারিত হয়েছে।
সুতরাং একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আইন এমন হওয়া উচিত, যা বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তানদের অবহেলা থেকে সুরক্ষা দেবে, কিন্তু একই সঙ্গে উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করবে।
এই বিলের উদ্দেশ্য যদি হয় বাবা-মাকে তাঁদের জীবনের শেষ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হওয়া থেকে রক্ষা করা, তাহলে সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে দ্বিমত করার কারণ নেই।
তবে আইনটির প্রয়োগ এমন হতে হবে যাতে “বাবা-মায়ের নিরাপত্তা” নিশ্চিত করতে গিয়ে “অন্য উত্তরাধিকারীর ন্যায্য অধিকার” অনিশ্চিত না হয়ে যায়।
কারণ সম্পত্তির প্রশ্নে শুধু মালিকানা নয়, ন্যায়বিচারও গুরুত্বপূর্ণ।
আর ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট:
অধিকার যার, তাকে তার অধিকার দিতে হবে।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com