একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় থাকতে হয় গণতান্ত্রিক বৈধতা, স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো এবং বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং সংসদীয় ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী নির্বাচন পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা কী?
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(১) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। তাঁকে সংসদ-সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত করা হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত একটি indirect election।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের Head of State এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যক্তির ঊর্ধ্বে সাংবিধানিক precedence ভোগ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন।
এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে থাকলেও তিনি সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে মূলত একটি constitutional head of state।
তাহলে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কি গণতান্ত্রিক?
আইনগতভাবে অবশ্যই এটি গণতান্ত্রিক এবং সংবিধানসম্মত।
কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি সংসদে একটি দল বা জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে এবং সেই দলই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্ধারণ করে তাহলে নির্বাচনটি কতটা প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
আইনগত বৈধতা (legal legitimacy) এবং জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট (direct popular mandate) এক বিষয় নয়।
বর্তমান সংবিধান সংসদীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছ মনোনয়ন এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কী কী থাকা উচিত?
একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্তত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১. যোগ্যতার কঠোর মানদণ্ড
রাষ্ট্রপতি শুধু রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেই যথেষ্ট নয়। তাঁর থাকতে হবে সাংবিধানিক জ্ঞান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা, নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা এবং পূর্বে impeachment-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত না হওয়ার মতো শর্ত রয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নৈতিক ও সাংবিধানিক যোগ্যতার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
২. প্রকৃত প্রতিযোগিতা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যদি এমন হয় যেখানে একজন প্রার্থী মনোনীত হওয়ার পর ফলাফল কার্যত আগেই নির্ধারিত, তাহলে নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তাই একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকা এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে তাঁদের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. গোপন ব্যালট ও স্বাধীন ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে হলেও তাঁদের ভোট যেন দলীয় চাপ, ভয় বা রাজনৈতিক নির্দেশের বাইরে স্বাধীনভাবে দেওয়ার সুযোগ থাকে, সেটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪. প্রার্থীর প্রকাশ্য পরিচিতি ও যাচাই
রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর:
* শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা,
* সম্পদ ও স্বার্থের সংঘাত,
* পূর্ববর্তী সরকারি বা রাজনৈতিক ভূমিকা,
* অপরাধমূলক রেকর্ড,
* সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি
জনসম্মুখে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলো কীভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে?
🇩🇪 জার্মানি: সংসদীয় ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল
জার্মানির Federal President জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না।
তাঁকে নির্বাচন করে Federal Convention। এই Convention-এর অর্ধেক সদস্য Bundestag-এর সদস্য এবং বাকি অর্ধেক Lander বা রাজ্যগুলোর পার্লামেন্ট দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি।
এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে।
দুই দেশেই রাষ্ট্রপতি মূলত সংসদীয় কাঠামোর সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান।
কিন্তু জার্মান ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, Bundestag-এর পাশাপাশি Lander-এর প্রতিনিধিরাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্তরের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থাকে।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি চিন্তার বিষয় হতে পারে।
🇮🇳 ভারত: সংসদ ও রাজ্যগুলোর সমন্বিত Electoral College
ভারতও সংসদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণ করে এবং সেখানে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না।
ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন একটি Electoral College দ্বারা। এতে লোকসভা ও রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্যদের পাশাপাশি রাজ্যগুলোর Legislative Assembly-এর নির্বাচিত সদস্যরা অংশ নেন। দিল্লি ও পুদুচেরির বিধানসভাও এর অংশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্বাচনটি proportional representation by means of single transferable vote পদ্ধতিতে এবং secret ballot-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।
ভারতের মডেল দেখায়, রাষ্ট্রপতির পদ যদি সংসদীয় ব্যবস্থার সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের পদ হয়, তাহলেও নির্বাচনে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের একটি ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র: সম্পূর্ণ ভিন্ন মডেল
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
সেখানে প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের Head of State এবং Head of Government দুটো ভূমিকাই পালন করেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে জনগণ প্রেসিডেন্টের জন্য ভোট দেয়, কিন্তু সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন Electoral College-এর মাধ্যমে। বর্তমানে Electoral College-এ ৫৩৮টি electoral vote রয়েছে এবং বিজয়ী হতে সাধারণত ২৭০টি ভোট প্রয়োজন।
এর আগে রাজনৈতিক দলগুলো primary ও caucus-এর মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করে।
অর্থাৎ, এখানে জনগণের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ব্যবস্থারও সমালোচনা রয়েছে। একজন প্রার্থী জাতীয় popular vote-এ বেশি ভোট পেয়েও Electoral College-এ পরাজিত হতে পারেন।
তাই কোনো বিদেশি মডেলকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য কোন মডেল উপযোগী?
বাংলাদেশ যেহেতু সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসরণ করে এবং রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর, তাই সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মডেল বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত হবে না।
বরং জার্মানি বা ভারতের মতো একটি শক্তিশালী indirect electoral model বাংলাদেশের জন্য বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে:
সংসদ সদস্য + স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি Electoral College গঠন করা যেতে পারে।
এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু জাতীয় সংসদ নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে, সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটের বর্তমান ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে প্রকৃত প্রতিযোগিতা, secret ballot, একাধিক প্রার্থী এবং স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরাসরি জনগণের ভোট কি আরও গণতান্ত্রিক?
প্রথম দেখায় উত্তরটি “হ্যাঁ” মনে হতে পারে।
কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।
যদি জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন অথচ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত থাকে তাহলে একজন সরাসরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বৈধতার দ্বৈত কেন্দ্র তৈরি হতে পারে।
এতে প্রশ্ন উঠতে পারে:
জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বনাম সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, কার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বেশি শক্তিশালী?
এ ধরনের দ্বন্দ্ব সংসদীয় ব্যবস্থায় সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে।
তাই সরাসরি নির্বাচন করার আগে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যও নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
শেষ কথা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল “কে রাষ্ট্রপতি হবেন” এই প্রশ্ন নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে:
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য, জনগণের আস্থা, সংসদের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। এই ব্যবস্থা নিজেই অসাংবিধানিক বা অগণতান্ত্রিক নয়। তবে একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনকে শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থবহ করা প্রয়োজন।
জার্মানি আমাদের দেখায় কীভাবে সংসদীয় ব্যবস্থায় Federal Convention-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যায়। ভারত দেখায় কীভাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের নিয়ে Electoral College গঠন করা যায়। আর যুক্তরাষ্ট্র দেখায় কীভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে একটি Electoral College-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো:
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এমন হতে হবে, যেখানে সংবিধানের বিধান, জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরস্পরের পরিপূরক হয়।
কারণ একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্র শুধু ভোটের সংখ্যায় শক্তিশালী হয় না বরং শক্তিশালী হয় যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU),
2nd LLM on LLM International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com