কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) মানবসভ্যতার জন্য এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি। চিকিৎসা, শিক্ষা, বিচার, গবেষণা, ব্যবসা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। কিন্তু প্রতিটি শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো AI-এরও একটি অন্ধকার দিক রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো Deepfake প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, অডিও এবং ভিডিও তৈরি করা।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে যা দেখতে একেবারে বাস্তব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ কৃত্রিম। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা তা নির্ধারণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয় বরং আইন, গণতন্ত্র, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
Deepfake কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?
Deepfake হলো AI-এর মাধ্যমে এমন ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তিকে এমন কথা বলতে বা এমন কাজ করতে দেখানো হয় যা তিনি বাস্তবে কখনোই করেননি।
এর অপব্যবহার হতে পারে বিভিন্নভাবে:
* রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি;
* নির্বাচনকে প্রভাবিত করা;
* ব্যক্তিগত সম্মানহানি;
* ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা;
* ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উসকানি;
* শেয়ারবাজার বা ব্যবসায়িক প্রতারণা;
* রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা।
একটি মাত্র ভুয়া ভিডিও কখনো কখনো হাজারো মানুষের মধ্যে উত্তেজনা, সহিংসতা কিংবা সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশের আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি
বাংলাদেশে Deepfake নিয়ে এখনো আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। তবে বিদ্যমান বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
১. সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩
যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তাহলে সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
২. দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860)
পরিস্থিতিভেদে নিম্নোক্ত অপরাধসমূহ প্রযোজ্য হতে পারে:
* প্রতারণা (Cheating)
* মানহানি (Defamation)
* জালিয়াতি (Forgery)
* ভয়ভীতি প্রদর্শন
* বিদ্বেষ বা সহিংসতায় উসকানি
৩. সংবিধানের ভারসাম্য
বাংলাদেশের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে এই স্বাধীনতারও সীমা রয়েছে।
যে মতপ্রকাশ:
* জনশৃঙ্খলা নষ্ট করে,
* রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে,
* অন্যের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে,
* বিদ্বেষ বা সহিংসতা ছড়ায়,
তা আইনের আওতায় আসতে পারে।
অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই মিথ্যা তথ্য প্রচারের স্বাধীনতা নয়।
উন্নত বিশ্বের আইনি অবস্থান
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)
EU AI Act অনুযায়ী AI-নির্মিত Deepfake কনটেন্টকে যথাযথভাবে লেবেল (Label) করতে হবে, যাতে দর্শক বুঝতে পারেন এটি AI-নির্মিত।
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে Deepfake ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে AI ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের Online Safety Act 2023 অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর দায়িত্ব আরোপ করেছে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের জন্য।
AI-ভিত্তিক যৌন হয়রানিমূলক Deepfake-এর বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের Protection from Online Falsehoods and Manipulation Act (POFMA) সরকারকে ভুয়া তথ্য দ্রুত সংশোধন বা অপসারণের ক্ষমতা দিয়েছে।
উত্তরণের পথ কী হতে পারে?
শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ।
১. AI শনাক্তকরণ প্রযুক্তি
Facebook, YouTube, Google, Microsoft-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত AI Detection System ব্যবহার করতে হবে।
২. ডিজিটাল ওয়াটারমার্কিং
AI দ্বারা তৈরি ছবি ও ভিডিওতে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক সংযুক্ত করা যেতে পারে।
৩. ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy)
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে “ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি” শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন।
৪. Fact-checking সংস্কৃতি
যে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মে যাচাই করা উচিত।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি
সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর আরও দ্রুত ক্ষতিকর ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
৬. আধুনিক আইন প্রণয়ন
বাংলাদেশেও Deepfake এবং AI-নির্ভর ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় পৃথক ও আধুনিক আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
প্রযুক্তি কখনোই নিজে ভালো বা খারাপ নয়।
মানুষ যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে, প্রযুক্তি সেভাবেই সমাজকে প্রভাবিত করে।
AI মানবজাতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু দায়িত্বহীন ব্যবহার এটিকে ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত করতে পারে।
আজ একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে, একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে পারে, এমনকি একটি দেশের সামাজিক শান্তিও বিনষ্ট করতে পারে।
সুতরাং AI-এর এই যুগে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো প্রযুক্তিগত সচেতনতা, শক্তিশালী আইন, নৈতিক ব্যবহার এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস।
কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়তো অস্ত্রের নয়, সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে বিজয়ী হবে সেই সমাজ, যারা প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং আইনের শাসনকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU),
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com