রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রপতি কি আইনের ঊর্ধ্বে? তিনি কি যেকোনো অপরাধ করলেও বিচার থেকে মুক্ত থাকবেন? নাকি তাঁর দায়মুক্তি শুধুমাত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ?
বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাংবিধানিক চর্চা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি সীমাহীন নয় বরং এটি একটি সীমিত সাংবিধানিক সুরক্ষা।
বাংলাদেশের সংবিধান কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫১ রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়টি নির্ধারণ করেছে।
১. রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যাবে নাঃ
রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে যে ক্ষমতা প্রয়োগ বা দায়িত্ব পালন করেন তার জন্য কোনো আদালতে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে হয় না।
এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের পক্ষে যে সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন সেগুলোর জন্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে টেনে নেওয়া যায় না।
এর উদ্দেশ্য রাষ্ট্রপতিকে “আইনের ঊর্ধ্বে” রাখা নয় বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে অযথা মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানি থেকে রক্ষা করা।
২. ফৌজদারি কার্যক্রমে বিশেষ সুরক্ষাঃ
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা শুরু বা পরিচালনা করা যায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তিনি আজীবন বিচারমুক্ত।
প্রশ্ন হলো, দায়মুক্তি কি চিরস্থায়ী?
উত্তর হলো, না।
দায়মুক্তি কেবল দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্য কার্যকর। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর যদি কোনো অপরাধের বিষয়ে আইনি ভিত্তি থাকে তাহলে প্রচলিত আইনের আওতায় বিচার হতে পারে। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে স্থায়ী ফৌজদারি অব্যাহতি দেয়নি।
৩. দেওয়ানি মামলাঃ
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেওয়ানি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রেও সংবিধান কিছু প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময় আগে নোটিশ প্রদানসহ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।
এটিও বিচার থেকে স্থায়ী অব্যাহতি নয় বরং একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রপতিকে কি অপসারণ করা যায়?
উত্তর হলো, হ্যাঁ।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট (Impeachment)-এর ব্যবস্থা রয়েছে।
যদি রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করেন বা গুরুতর অসদাচরণে লিপ্ত হন তাহলে সংসদ নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে অপসারণ করতে পারে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতির জবাবদিহির পথ পুরোপুরি বন্ধ নয় বরং সেটি আদালতের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
কোন ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগ নেই?
সংবিধানের কোথাও বলা হয়নি যে রাষ্ট্রপতি যেকোনো অপরাধ করলেও তিনি চিরতরে দায়মুক্ত থাকবেন।
দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর যদি হত্যা, দুর্নীতি, ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত অপরাধের অভিযোগের আইনি ভিত্তি থাকে তাহলে প্রচলিত আইনের আওতায় বিচার হওয়ার সাংবিধানিক বাধা নেই।
অর্থাৎ, দায়মুক্তি পদকে দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তিকে নয়।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কী হয়?
🇮🇳 ভারত
ভারতের সংবিধানের Article 361 রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনকালীন মামলা থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে এটি স্থায়ী দায়মুক্তি নয়। দায়িত্ব শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনকালে কিছু সীমিত সাংবিধানিক সুরক্ষা ভোগ করেন। তবে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তিনি ফৌজদারি তদন্ত বা বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও হয়েছে যা দেখায় যে পদমর্যাদা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না।
🇫🇷 ফ্রান্স
ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট সুরক্ষা পান। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব।
🇦🇩 জার্মানি
জার্মানির রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও বিশেষ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁকে সাংবিধানিক আদালতের মাধ্যমে অপসারণের ব্যবস্থা করা যায়।
দায়মুক্তির দর্শন কী?
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে নির্বিঘ্ন রাখা।
যদি প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের জন্য রাষ্ট্রপতিকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হতে হতো তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যাহত হতে পারত।
কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হলো, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এই কারণেই অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি সাময়িক, সীমিত এবং সাংবিধানিক, স্থায়ী বা ব্যক্তিগত নয়।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির পদ মর্যাদাপূর্ণ কিন্তু সেই মর্যাদা তাঁকে আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে তবে জবাবদিহির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। প্রকৃত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদেও অধিষ্ঠিত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত সংবিধান, আইন এবং জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ।
শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় ক্ষমতার অবারিত ব্যবহার নয় বরং ক্ষমতার ওপর কার্যকর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University (LSBU), UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com