ইতিহাসের প্রতিটি গণআন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয় বরং একটি জাতির আত্মবিশ্লেষণেরও সুযোগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়। এই অধ্যায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্র, ক্ষমতা কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোয় নয় বরং রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের ওপর।
যখন নাগরিকের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হয়, যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, যখন মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সমাজে ক্ষোভ জমতে থাকে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সেই ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরিত হয়। তাই কোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জনগণের কথা শোনা, তাদের অধিকারকে সম্মান করা এবং সংবিধানের মৌলিক চেতনাকে সমুন্নত রাখা।
জুলাই আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে, মতের ভিন্নতা কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়। বরং ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করার মধ্যেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য নিহিত। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো বিতর্ক, সংলাপ এবং অংশগ্রহণ। বিরোধী মতকে দমন নয় বরং যুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।
একই সঙ্গে আমাদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো আন্দোলনের লক্ষ্য যদি ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হয় তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনের পরও দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তখনই শুরু হয় আরও বড় দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্র গঠনের কাজ আবেগ দিয়ে শুরু হলেও তা টিকে থাকে আইন, প্রতিষ্ঠান এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ওপর।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়, ব্যক্তিপূজা নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। কোনো ব্যক্তি চিরস্থায়ী নন কিন্তু শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দেয়।
একজন নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নয়, সত্য প্রচার করা। মতের ভিন্নতার কারণে ঘৃণা নয়, সম্মান প্রদর্শন করা। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে যখন সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিকতা এবং পারস্পরিক সহনশীলতা আরও দৃঢ় হয়।
জুলাইয়ের ঘটনাবলি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মূল্য তখনই সৃষ্টি হয় যখন আমরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। যদি আমরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে না পারি তবে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতেই থাকবে।
আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় গ্রহণ করি যেখানে আইনের শাসন হবে সর্বোচ্চ, নাগরিকের মর্যাদা হবে অটুট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট থাকবে।
জুলাই আমাদের শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি দেয়নি বরং দিয়েছে একটি দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব হলো এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার বড়, বিভেদের চেয়ে ঐক্য বড়, আর ব্যক্তি নয়, সংবিধান ও আইনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ভিত্তি।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com