সম্প্রতি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কোনো একটি অংশকে পৃথক প্রদেশ বা বিশেষ অঞ্চল হিসেবে গঠনের দাবি নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা মতামতের প্রশ্ন নয় বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক কাঠামো এবং জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালা স্পষ্টভাবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের কথা ঘোষণা করেছে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হবে সংবিধানের অধীন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাঠামো, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খেয়াল-খুশির বিষয় নয় বরং তা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত একটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় ভিত্তি।
বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও কোনো একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর ইতিহাস নয় বরং এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তি ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বিভাজন নয়, ঐক্যই আমাদের শক্তি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই একটি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার সীমাহীন নয়। যখন কোনো বক্তব্য জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, রাষ্ট্রীয় সংহতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অথবা একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে পৃথক রাজনৈতিক সত্তার ধারণার দিকে উৎসাহিত করে তখন তা কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় থাকে না বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন এবং জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় পরিচয় একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় কিন্তু জাতীয় পরিচয় আমাদের সবার অভিন্ন পরিচয়। একজন মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হওয়ার আগে আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এই পরিচয়ের মধ্যেই আমাদের সমঅধিকার, সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং নাগরিক মর্যাদা নিহিত।
ইতিহাস প্রমাণ করে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভাজনের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্ম দিয়েছে। কোনো রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই কোনো বৈধ দাবি থাকলে তার সমাধান সংবিধান ও আইনের কাঠামোর মধ্যেই খুঁজতে হবে। বিভাজনের ভাষা নয়, প্রয়োজন অধিকার, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভাষা।
আজকের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সকল অপচেষ্টা প্রতিহত করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এমন একটি রাষ্ট্র রেখে যাওয়া, যেখানে ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, মত ভিন্ন হতে পারে কিন্তু দেশের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা হবে অভিন্ন।
বাংলাদেশ কারও একার নয়। বাংলাদেশ আমাদের সবার। আর এই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com