হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি রাষ্ট্রের ঐক্যের বিরুদ্ধে উসকানি?

Freedom of speech June 22, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি রাষ্ট্রের ঐক্যের বিরুদ্ধে উসকানি?

সম্প্রতি একজন হিন্দু আইনজীবী বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা চলছে। এই বক্তব্য জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত? বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে কী বলে? আর এমন বক্তব্যের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্যই বা কী হতে পারে?

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার প্রদান করেছে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে বৈষম্যের শিকার করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। যদিও সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ কেবল মুসলমানদের নয় বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল নাগরিকের রাষ্ট্র।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষা, ব্যবসা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, চিকিৎসা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, বিচারপতি, রাষ্ট্রদূত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে হিন্দু নাগরিকরা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন। বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে হতে পারে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। তবে সেই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও জাতীয় ঐক্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। কোনো বক্তব্য যদি জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ায় অথবা রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে তা আইনগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।

প্রকৃতপক্ষে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো সম্প্রদায়ের সমস্যা থাকলে তার সমাধান বিচ্ছিন্নতা নয় বরং অধিকতর ন্যায়বিচার, সমঅধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার জন্য আলাদা রাষ্ট্র বা প্রদেশ গঠনের পথ নয় বরং সাংবিধানিক সুরক্ষা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের সমান প্রয়োগকে গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যে। এই দেশে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। তাই বিভাজনের ভাষা নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের ভাষা। কোনো সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি থাকলে তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই উপস্থাপন ও সমাধান করা উচিত।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজেকে অনিরাপদ মনে করবে না, আবার এমন কোনো বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য হবে না যা জাতির ঐক্য ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ আমাদের পরিচয় প্রথমত বাংলাদেশি  তারপর অন্য সব পরিচয়।

জাতীয় ঐক্যই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই শক্তিকে দুর্বল করে এমন যেকোনো বক্তব্যের বিষয়ে আমাদের সকলেরই দায়িত্বশীল ও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

Barrister Md Sohrawardy Saddam 

Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU)

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University, UK.

Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!