দুর্নীতির শিকড় কোথায়: ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থা?

Corruption June 19, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
দুর্নীতির শিকড় কোথায়: ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থা?

দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে দায়ী করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্নীতির প্রকৃত শিকড় কোথায়? এটি কি কেবল কিছু অসৎ ব্যক্তির সমস্যা নাকি এর পেছনে রয়েছে দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দণ্ডবিধি, সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং বিভিন্ন বিশেষ আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেও একই চিত্র দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, আইন যদি থাকে, শাস্তির ব্যবস্থাও যদি থাকে, তাহলে দুর্নীতি কমে না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শুধু আইনের বই নয় বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামাজিক মূল্যবোধের দিকেও তাকাতে হবে।

বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি কখনো আইনের অভাবে বাড়ে না বরং আইনের অসম প্রয়োগ, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বিস্তার লাভ করে।

অনেক সময় দেখা যায়, একই ধরনের অপরাধে একজন কঠোর শাস্তি পায় কিন্তু অন্যজন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যায়। যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান নয় তখন আইনের ভয় নয় বরং প্রভাবশালী হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আর সেখান থেকেই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

দুর্নীতির আরেকটি বড় কারণ হলো প্রশাসনিক জটিলতা। কোনো সেবা পেতে যদি সাধারণ মানুষকে অযৌক্তিক সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হতে হয় তাহলে ঘুষ একটি বিকল্প পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি শুধু ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা নয় বরং এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থারও ফল।

উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা নরওয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাদের সাফল্যের পেছনে কেবল কঠোর আইন নয় বরং কয়েকটি মৌলিক নীতি কাজ করেছে।

প্রথমত, আইনের সমান প্রয়োগ। সেখানে একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য আলাদা বিচারব্যবস্থা নেই। ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধেও তদন্ত ও বিচার কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।

দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন সংস্থা, বিচার বিভাগ, অডিট প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।

তৃতীয়ত, সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা। সরকারি ব্যয়, ক্রয়, নিয়োগ এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ফলে গোপন অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।

চতুর্থত, ডিজিটাল প্রশাসন। সিঙ্গাপুর এবং এস্তোনিয়ার মতো দেশগুলো সরকারি সেবার বড় অংশ অনলাইনে নিয়ে এসেছে। যেখানে কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগ কম সেখানে ঘুষের সুযোগও কমে যায়।

পঞ্চমত, সামাজিক ও নৈতিক সংস্কৃতি। উন্নত দেশগুলোতে দুর্নীতি শুধু আইনি অপরাধ নয় বরং এটি সামাজিকভাবে লজ্জাজনক আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়। ফলে আইনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনের সংখ্যা বৃদ্ধি নয় বরং বিদ্যমান আইনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সফল লড়াই তখনই সম্ভব হবে যখন তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

সমস্যা থেকে উত্তরণের পথঃ

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড থাকলে দুর্নীতি কখনো কমবে না।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত ও বিচার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন বৃদ্ধি করতে হবে। যত কম মানবিক হস্তক্ষেপ থাকবে ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।

চতুর্থত, তথ্য অধিকার ও স্বচ্ছতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের ওপর সামাজিক নজরদারি বাড়ে।

পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।

ষষ্ঠত, হুইসেলব্লোয়ার বা অনিয়ম প্রকাশকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। অনেক অনিয়ম প্রকাশ পায় না শুধুমাত্র প্রতিশোধের ভয়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্নীতিকে কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। দুর্নীতি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে, ন্যায়বিচারকে দুর্বল করে, বিনিয়োগ ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আদালতের রায় দিয়ে শেষ হয় না বরং এটি শুরু হয় রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কারণ দুর্নীতির প্রকৃত প্রতিষেধক কেবল কঠোর শাস্তি নয় বরং নিশ্চিত শাস্তি।

দুর্নীতির শিকড় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা, তিনটির মধ্যেই বিস্তৃত। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। কেবল ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যেখানে সততা হবে সুবিধাজনক এবং দুর্নীতি হবে ঝুঁকিপূর্ণ।

আইন যতই কঠোর হোক যদি অপরাধী বিশ্বাস করে যে সে ধরা পড়বে না বা বিচার এড়িয়ে যেতে পারবে তাহলে সেই আইন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যখন মানুষ নিশ্চিত হবে যে আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধের পরিণতি অনিবার্য তখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে।

Barrister Md Sohrawardy Saddam

Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU)

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University, UK.

Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!