প্রতিবার কোনো নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এলে একটি প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হয়: অপরাধ বাড়ছে কেন?
কেউ বলেন, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ই এর মূল কারণ। আবার কেউ মনে করেন, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থতাই অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বাস্তবে প্রশ্নটি এতটা সরল নয়। অপরাধ একটি বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা যার পেছনে যেমন সামাজিক ও পারিবারিক কারণ রয়েছে তেমনি রয়েছে আইনের প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রভাব।
অপরাধ কি সত্যিই বাড়ছে?
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে অপরাধের সংবাদপ্রবাহ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অপরাধ বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দেশের এক প্রান্তের ঘটনা মুহূর্তেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এটাও সত্য যে, কিছু অপরাধের প্রকৃতি ও ভয়াবহতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কিশোর অপরাধ, সাইবার অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়: অপরাধের উর্বর ক্ষেত্রঃ
আইন কখনো একা একটি সমাজকে নৈতিক করতে পারে না। আইন অপরাধ দমন করতে পারে কিন্তু মানুষের বিবেক তৈরি করতে পারে না।
একসময় পরিবারকে বলা হতো মানুষের প্রথম বিদ্যালয়। পারিবারিক মূল্যবোধ, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা মূলত পরিবার থেকেই শেখা হতো। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে সেই শিক্ষার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
আজ অনেক সন্তান সফল পেশাজীবী হলেও মানবিক মূল্যবোধে পিছিয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জিত হচ্ছে কিন্তু সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতা একই হারে বিকশিত হচ্ছে না।
যে সমাজে অর্থকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় সেখানে নৈতিকতা অনেক সময় দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রতারণা, দুর্নীতি, সহিংসতা এবং স্বার্থপরতা।
আইনের দুর্বল প্রয়োগ: অপরাধের সাহসঃ
অন্যদিকে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাবও অপরাধ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
আইনের মূল শক্তি শুধু শাস্তির কঠোরতায় নয় বরং শাস্তির নিশ্চিততায়। একজন অপরাধী যদি বিশ্বাস করে যে সে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতার সুযোগ নিয়ে শাস্তি এড়াতে পারবে তাহলে আইনের ভয় অনেকাংশে কমে যায়।
ইতালীয় অপরাধবিজ্ঞানী Cesare Beccaria বহু আগে বলেছিলেন:
“শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চিততা বেশি কার্যকর।”
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব এবং মামলার জট অপরাধ দমনে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
যখন মানুষ দেখে কোনো মামলার বিচার হতে দশ-পনেরো বছর লেগে যাচ্ছে তখন আইনের প্রতিরোধমূলক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কেবল কঠোর আইন কি সমাধান?
আমাদের সমাজে প্রায়ই নতুন অপরাধের পর নতুন আইন বা সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ড থাকা সত্ত্বেও অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কারণ অপরাধের উৎস যদি সামাজিক ও মানসিক হয় তাহলে কেবল শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
একজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা সহজ কিন্তু কেন সে গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়ালো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মাদক ব্যবসায়ীকে কারাগারে পাঠানো সম্ভব কিন্তু মাদক গ্রহণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ দূর না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
পিতা-মাতার ভূমিকা: আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশঃ
সন্তানের নৈতিক বিকাশের প্রথম দায়িত্ব পরিবার এবং বিশেষ করে পিতা-মাতার।
শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, ব্যয়বহুল শিক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করাই পিতা-মাতার দায়িত্বের শেষ কথা নয়। সন্তানকে মানবিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ শেখানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় আমরা সন্তানকে সফল মানুষ বানানোর চেষ্টা করি কিন্তু ভালো মানুষ বানানোর প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যায়।
অন্যদিকে সন্তানদের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে বয়স্ক পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, যত্ন ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের। পরিবার যখন পারস্পরিক দায়িত্ববোধের জায়গা হারিয়ে ফেলে তখন তার প্রতিফলন পুরো সমাজেই দেখা যায়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
অপরাধ দমনের জন্য কেবল আইন বা কেবল নৈতিক শিক্ষা কোনো একক উপায় যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি—
* পরিবারে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা।
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা বৃদ্ধি করা।
* আইনের নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
* বিচারপ্রক্রয়ার অযথা দীর্ঘসূত্রিতা কমানো।
* সাক্ষী সুরক্ষা ও তদন্ত ব্যবস্থার উন্নয়ন।
* যুবসমাজের জন্য ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা।
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ উৎসাহিত করা।
সবশেষে বলা যায়, অপরাধ বৃদ্ধির প্রশ্নে সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবে দুটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
যেখানে নৈতিকতা দুর্বল সেখানে অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। আর যেখানে আইনের কার্যকর প্রয়োগ দুর্বল সেখানে অপরাধীরা সাহস পায়।
একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই যখন পরিবার মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, শিক্ষা ব্যবস্থা দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে এবং রাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে আইনের চোখে সবাই সমান।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির নিরাপত্তা শুধু তার আইন দিয়ে নয় বরং তার বিবেক দিয়েও নির্ধারিত হয়।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com