একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ নারীদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা প্রদান করে তার ওপর। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য আজও আমাদের সমাজে অসংখ্য নারী শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতন ঘটে ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে যেখানে একজন নারীর সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকার কথা।
নারীর প্রতি সহিংসতা কোনো পারিবারিক বিষয় নয়, কোনো ব্যক্তিগত বিরোধও নয়। এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আইনের দৃষ্টিতে একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেন এই অপরাধ কমছে না?
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা নারীর সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান। আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে কিন্তু আইন একা সমাজকে মানবিক করতে পারে না। আদালত রায় দিতে পারে কিন্তু মানুষের বিবেক জাগিয়ে তুলতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতার শিকড় আইনের দুর্বলতায় নয় বরং সামাজিক মানসিকতায়। এখনও এমন ধারণা প্রচলিত যে স্বামী স্ত্রীর ওপর কর্তৃত্ব করবে, তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে, এমনকি তাকে অপমান বা নিয়ন্ত্রণ করাও যেন স্বাভাবিক বিষয়। এই চিন্তাধারা শুধু ভুল নয় এটি একটি বিপজ্জনক সামাজিক ব্যাধি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে এখনও কিছু পুরুষ আছেন যারা মনে করেন স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করা, অপমান করা, গালিগালাজ করা কিংবা ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখাই পুরুষত্বের পরিচয়। তারা মনে করেন স্ত্রীকে সবসময় নিচু অবস্থানে রাখলেই পরিবারের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একজন প্রকৃত পুরুষ তার শক্তি প্রদর্শন করেন না দুর্বলকে দমিয়ে রেখে বরং সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেন। স্ত্রীকে অপমান করা, তার মতামতকে অবমূল্যায়ন করা, মানসিক নির্যাতন করা কিংবা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে না দেওয়া কোনো সুপুরুষের বৈশিষ্ট্য নয় বরং এটি দুর্বল মানসিকতা, অনিরাপত্তাবোধ এবং অসুস্থ ক্ষমতাচর্চার বহিঃপ্রকাশ।
আইনের দৃষ্টিতেও এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অনুযায়ী শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক, মৌখিক ও আবেগগত নির্যাতনও সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ স্ত্রীকে নিয়মিত গালিগালাজ করা, অপমান করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করা বা মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করাও আইনের চোখে অপরাধ।
ইসলামও এ ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কখনো তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে।” সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে অসম্মান করে, গালিগালাজ করে বা নির্যাতন করে সে শুধু সামাজিকভাবে নিন্দনীয় নয় বরং ইসলামের নৈতিক শিক্ষারও পরিপন্থী।
একজন নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা পুরুষত্বের প্রমাণ নয়। প্রকৃত পুরুষত্ব হলো নিজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংযমী থাকা, সম্মান দেওয়া, পাশে দাঁড়ানো এবং জীবনের সঙ্গীকে সমান মর্যাদায় মূল্যায়ন করা। কারণ একটি সুখী পরিবার ভয় দিয়ে নয় বরং ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে।
বিবাহ কোনো ব্যক্তিকে অন্য একজন মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার লাইসেন্স দেয় না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং সহযোগিতা। যে সম্পর্কে ভয় থাকে সেখানে ভালোবাসা টিকে না, যেখানে অপমান থাকে, সেখানে মর্যাদা থাকে না, আর যেখানে সহিংসতা থাকে, সেখানে পরিবার নয় বরং একটি নীরব কারাগার গড়ে ওঠে।
ইসলামও নারীর প্রতি সম্মান ও সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।” অতএব ধর্মের নামে কিংবা সংস্কৃতির নামে নারীর প্রতি অসদাচরণ বা সহিংসতার কোনো নৈতিক বা ধর্মীয় বৈধতা নেই।
উন্নত বিশ্বে নারী নির্যাতনকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না বরং এটি একটি সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং দ্রুত বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে, শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধ এবং সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশেও প্রয়োজন একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে নারী কোনো সম্পত্তি নয়, কোনো অধীনস্থ ব্যক্তি নয় বরং তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতা রয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করার লড়াই কেবল আদালতের নয়, কেবল পুলিশের নয়, কেবল সরকারেরও নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয় যখন সেখানে নারীরা ভয় নয়, মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।
আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে কিন্তু একটি সমাজকে মানবিক করে তোলে মানুষের বিবেক। তাই নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ শুধু আইনের কঠোরতা নয় বরং আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা এবং বিবেকের জাগরণ।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com