সম্প্রতি জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য দুইজন নারী সংসদ সদস্যের হিজাব ও বোরকা পরিধান নিয়ে কটুক্তিমূলক মন্তব্য করেছেন এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয় বরং এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারীর মর্যাদা এবং সংসদীয় শালীনতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে তার ধর্ম পালন, প্রচার এবং চর্চার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ কোনো নারী যদি ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে হিজাব বা বোরকা পরিধান করেন তবে সেটি তার মৌলিক অধিকারের অংশ।
অন্যদিকে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের সমতা এবং বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিকে তার ধর্ম, লিঙ্গ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে হেয় করা কিংবা অবমাননার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনেকে যুক্তি দিতে পারেন যে, একজন সংসদ সদস্য তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগ করেছেন। নিঃসন্দেহে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো গণতন্ত্রেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। যখন সেই বক্তব্য অন্যের মর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা কিংবা সামাজিক সম্প্রীতিকে আঘাত করে তখন সেটি দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের সীমা অতিক্রম করতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মন্তব্যটি কোনো সাধারণ নাগরিকের নয় বরং এটি এসেছে একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে। সংসদ সদস্যরা কেবল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন তারা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অংশ। তাদের বক্তব্যে তাই ব্যক্তিগত মতামতের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দায়িত্ববোধ, সংযম এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, যিনি এই মন্তব্য করেছেন তিনি নিজেও ধর্মীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দাড়ি ও টুপি ধারণ করেন। যদি একজন ব্যক্তির নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের অধিকার থাকে তবে অন্য একজন নারীর ধর্মীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশকে বিদ্রূপ করা নৈতিক ও যৌক্তিকভাবে একটি দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রে সমান অধিকারের অর্থ হলো নিজের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের স্বাধীনতার প্রতিও সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর ১৮ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর ১৮ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ ও পালন করার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো ধর্মীয় পোশাক পরিধানকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সংসদীয় চর্চা থেকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারি। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট, কানাডার হাউস অব কমন্স কিংবা ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক বা বিশ্বাসকে আক্রমণ করার পরিবর্তে নীতিগত বিতর্ককে উৎসাহিত করা হয়। কারণ সংসদ কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার মঞ্চ নয় বরং এটি জনগণের সমস্যা সমাধানের স্থান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা কি ভিন্ন মত, ভিন্ন পোশাক ও ভিন্ন বিশ্বাসকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলব নাকি ব্যক্তিগত পরিচয়কে বিদ্রূপ করে বিভাজনের রাজনীতিকে আরও উৎসাহিত করব।
সংসদে আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতি, বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। কোনো নারী কী পোশাক পরবেন, কীভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করবেন, তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে এই মৌলিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাই সভ্য গণতন্ত্রের পরিচায়ক।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য একরূপতায় নয় বরং ভিন্নতার মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার সক্ষমতায়। আর সংসদের মর্যাদা তখনই রক্ষা পায় যখন সেখানে মতের সংঘর্ষ হয় কিন্তু মর্যাদার নয়, বিতর্ক হয় নীতির, ব্যক্তিগত পরিচয়ের নয়।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com