বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচারের পথ

ADR April 29, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচারের পথ

বাংলাদেশে মামলা জট দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। বছরের পর বছর অসংখ্য মামলা বিচারাধীন থাকায় সাধারণ মানুষ সময়মতো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। >ADR কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ ADR হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে আদালতের বাইরে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। মধ্যস্থতা (Mediation), সালিশ (Arbitration) ও আলোচনা (Negotiation) এর প্রধান উপায়। বাংলাদেশে এর আইনি ভিত্তি রয়েছে Arbitration Act, 2001 এবং Code of Civil Procedure, 1908 এর সংশ্লিষ্ট বিধানে। >বর্তমান প্রেক্ষাপট দেশে ADR ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে বিশেষ করে পারিবারিক, দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক বিরোধে। আদালত অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। তবুও এটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

>ADR-এর সুবিধা (Advantages)

১. সময় সাশ্রয়ী বিচারপ্রক্রিয়া আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে কোন কোন সময় বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। ADR-এর মাধ্যমে একই বিরোধ কয়েকটি বৈঠকের মধ্যেই সমাধান সম্ভব হয়। বিশেষ করে পারিবারিক বা ছোটখাটো বাণিজ্যিক বিরোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

২. ব্যয় কম মামলার কোর্ট ফি, আইনজীবীর দীর্ঘমেয়াদি ফি, যাতায়াত খরচ সব মিলিয়ে আদালতের মামলা ব্যয়বহুল। ADR-এ তুলনামূলক কম খরচে সমাধান পাওয়া যায় যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জন্য বড় সুবিধা।

৩. প্রক্রিয়ার নমনীয়তা আদালতের কঠোর নিয়ম-কানুনের বাইরে ADR অনেক বেশি নমনীয়। পক্ষগুলো নিজের সুবিধামতো সময়, স্থান ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারে। এতে প্রক্রিয়া সহজ ও অংশগ্রহণমূলক হয়।

৪. গোপনীয়তা রক্ষা আদালতের বিচার সাধারণত উন্মুক্ত থাকে কিন্তু ADR প্রক্রিয়া গোপনীয়। ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না করে বিরোধ মীমাংসা করা যায়।

৫. সম্পর্ক বজায় রাখা আদালতের রায় অনেক সময় এক পক্ষের জয় ও অন্য পক্ষের পরাজয় নিশ্চিত করে ফলে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ADR-এ পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে “উইন-উইন” সমাধান সম্ভব যা পারিবারিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সহায়ক।

৬. পক্ষগুলোর নিয়ন্ত্রণ বেশি ADR-এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় না (বিশেষত mediation-এ) পক্ষগুলো নিজেরাই সমাধানে পৌঁছায়। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

৭. আদালতের চাপ কমানো বড় পরিসরে ADR ব্যবহার করলে আদালতের মামলা জট কমে এবং বিচারব্যবস্থা আরও কার্যকর হয়।

>চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা (Challenges & Limitations)

১. সচেতনতার অভাব বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনো ADR সম্পর্কে জানে না বা এর প্রতি আস্থা রাখে না। ফলে তারা সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হয়।

২. দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারীর সংখ্যা সীমিত। দক্ষতার অভাবে অনেক সময় সঠিকভাবে প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় না।

৩. বাধ্যতামূলক নয় (অনেক ক্ষেত্রে) ADR অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী। কোনো পক্ষ যদি অংশগ্রহণে অনীহা দেখায় তাহলে প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় বা ভেঙে পড়ে।

৪. ক্ষমতার অসমতা পক্ষগুলোর মধ্যে আর্থিক বা সামাজিক ক্ষমতার পার্থক্য থাকলে দুর্বল পক্ষ চাপে পড়ে অন্যায্য সমঝোতায় বাধ্য হতে পারে বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক সালিশে।

৫. আইনগত প্রয়োগের দুর্বলতা কিছু ক্ষেত্রে ADR-এর মাধ্যমে হওয়া সমঝোতা দ্রুত বা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় না ফলে পক্ষগুলোর আস্থা কমে।

৬. গ্রামীণ সালিশের সীমাবদ্ধতা গ্রামে প্রচলিত সালিশ ব্যবস্থায় কখনো পক্ষপাতিত্ব, সামাজিক চাপ বা আইনের ভুল প্রয়োগ দেখা যায়, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে।

৭. সব ধরনের মামলায় প্রযোজ্য নয় ফৌজদারি গুরুতর অপরাধ, সংবিধানিক প্রশ্ন বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় ADR-এর মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়।

৮. নজরদারির অভাব ADR প্রক্রিয়ায় সবসময় কার্যকর তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না ফলে সেবার গুণগত মান ভিন্ন হতে পারে।

>সমস্যা থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় ADR-কে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে নিচের পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ:-

১. বাধ্যতামূলক প্রি-ট্রায়াল মেডিয়েশন চালু করা মামলা দায়েরের আগে নির্দিষ্ট ধরনের দেওয়ানি মামলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু করা গেলে আদালতের চাপ অনেক কমবে।

২. বিশেষায়িত ADR সেন্টার স্থাপন প্রতিটি জেলা ও বিভাগে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ADR সেন্টার গড়ে তোলা দরকার যেখানে প্রশিক্ষিত প্যানেল থাকবে।

৩. প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা মধ্যস্থতাকারী ও সালিশকারীদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং চালু করতে হবে যাতে সেবার মান নিশ্চিত হয়।

৪. আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো আইনজীবীদের ADR-এ উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে কারণ অনেক সময় তারাই পক্ষগুলোকে প্রভাবিত করেন। ৫. প্রযুক্তি নির্ভর অনলাইন ADR ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইন মধ্যস্থতা চালু করলে দূরবর্তী এলাকার মানুষও সহজে সেবা পাবে।

৬. সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম স্কুল-কলেজ ও গণমাধ্যমে ADR বিষয়ে শিক্ষা ও প্রচারণা বাড়াতে হবে যাতে মানুষ আদালতের বাইরে সমাধানের পথ সম্পর্কে জানে।

৭. গ্রামীণ সালিশ ব্যবস্থার সংস্কার স্থানীয় সালিশকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে পক্ষপাতিত্ব কমে।

৮. দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ADR-এর মাধ্যমে হওয়া সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার জন্য শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা দরকার যাতে পক্ষগুলো আস্থা পায়। ৯. সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয় সরকার, এনজিও ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে ADR আরও বিস্তৃত হবে।

১০. বিশেষ খাতে ADR সম্প্রসারণ ব্যাংকিং, বাণিজ্যিক বিরোধ, শ্রম বিরোধ ইত্যাদি নির্দিষ্ট খাতে ADR বাধ্যতামূলক বা অগ্রাধিকারভিত্তিক করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) কেবল একটি বিকল্প পদ্ধতি নয়, এটি একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যা বিচার ব্যবস্থার উপর চাপ কমাতে এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ADR বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

Barrister Md Sohrawardy Saddam 

Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU), 

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University, UK.

Founder Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!