আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নাকি জনস্বার্থের বিপর্যয়?

Rule of Proportionality June 12, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নাকি জনস্বার্থের বিপর্যয়?

সম্প্রতি ছয়জন নবজাতক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি নবজাতকের মৃত্যু যেমন একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি তেমনি একাধিক নবজাতকের মৃত্যু পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং জবাবদিহিতার দাবি তৈরি হয়েছে।

কিন্তু একটি আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে প্রশ্নটি কেবল আবেগের নয় বরং এটি ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা এবং জনস্বার্থেরও প্রশ্ন।

প্রশ্ন হলো, কোনো হাসপাতালে সংঘটিত একটি গুরুতর ও মর্মান্তিক ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত এবং আইনসম্মত?

বাংলাদেশে হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা নিয়ন্ত্রিত হয় Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার মাধ্যমে। আইনের দৃষ্টিতে কোনো হাসপাতাল রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে, নির্ধারিত মানদণ্ড লঙ্ঘন করলে কিংবা গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে আইনের আরেকটি মৌলিক নীতি হলো “Proportionality” বা অনুপাতিকতা। অর্থাৎ অপরাধ, অবহেলা বা ব্যর্থতার সঙ্গে শাস্তির একটি যৌক্তিক ও ন্যায্য সামঞ্জস্য থাকতে হবে।

আইন ব্যক্তির দায়কে স্বীকৃতি দেয়, প্রতিষ্ঠানের নয়। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল প্রশাসন অথবা কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই হবে ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক পথ। অন্যদিকে, যদি প্রমাণিত হয় যে হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা প্রটোকল দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থ ছিল এবং তা ধারাবাহিকভাবে রোগীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহ তদারকি করে Care Quality Commission (CQC)। কোনো হাসপাতালে চিকিৎসাগত অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে সাধারণত স্বাধীন তদন্ত পরিচালিত হয়, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, হাসপাতালকে “Special Measures”-এর আওতায় আনা হয়, জরিমানা আরোপ করা হয় অথবা নির্দিষ্ট বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো Mid Staffordshire NHS Foundation Trust কেলেঙ্কারি। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে শত শত রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পরও হাসপাতালটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়নি। বরং একটি স্বাধীন Public Inquiry গঠন করা হয়, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে State Health Department তদন্ত করে, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হতে পারে, হাসপাতালের Accreditation ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে। তবে একটি হাসপাতাল হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সাধারণত সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সিঙ্গাপুরেও চিকিৎসাগত ত্রুটির ঘটনায় Root Cause Analysis-এর মাধ্যমে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হয়। উদ্দেশ্য থাকে কেবল দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা।

এখানেই আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আদ-দ্বীন দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তুলনামূলক কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে আসছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাধারণ মানুষ যাদের উন্নত ও ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের সেবা গ্রহণের আর্থিক সক্ষমতা নেই।

তাই রাষ্ট্রের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়:

প্রথমত, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী?

দ্বিতীয়ত, এটি কি কয়েকজন ব্যক্তির অবহেলার ফল নাকি পুরো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ব্যর্থতা?

তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কি সম্পন্ন হয়েছে?

চতুর্থত, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

পঞ্চমত, নিম্ন আয়ের জনগণের জন্য বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা কি নিশ্চিত করা হয়েছে?

আইনের শাসনের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এটি আবেগ নয় বরং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হতে হবে তদন্তনির্ভর, ন্যায়সঙ্গত এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ বিবেচনায় গ্রহণকৃত।

যদি কোনো হাসপাতালের একটি বিভাগে ব্যর্থতা ঘটে তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করাই একমাত্র সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, নিরাপত্তা প্রটোকল শক্তিশালীকরণ, নির্দিষ্ট বিভাগ স্থগিতকরণ, আর্থিক জরিমানা, বাধ্যতামূলক তদারকি এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অধিক কার্যকর হতে পারে।

কারণ ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয় বরং দায় নির্ধারণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে জনস্বার্থ রক্ষা করা।

অতএব, আদ-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের মূল দাবি হওয়া উচিত একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। তদন্তে যার দায় প্রমাণিত হবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হবে, একটি সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া বৃহত্তর জনস্বার্থকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয় যখন রাষ্ট্র জনরোষের মুহূর্তেও আবেগের পরিবর্তে ন্যায়, যুক্তি এবং প্রমাণের পথ অনুসরণ করে।

Barrister Md Sohrawardy Saddam

Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU)

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University, UK

Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!