একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা শুধু আদালত, বিচারক বা আইন দিয়েই নির্ধারিত হয় না বরং আইনজীবীদের স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকার উপরও তা সমানভাবে নির্ভরশীল। কারণ আদালতে একজন অভিযুক্ত, ভুক্তভোগী কিংবা সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ান আইনজীবী। যদি আইনজীবী স্বাধীনভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তবে ন্যায়বিচারের পুরো কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ১৯৯০ সালে কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত অষ্টম United Nations Congress on the Prevention of Crime and the Treatment of Offenders-এ জাতিসংঘ “Basic Principles on the Role of Lawyers” গ্রহণ করে। এটি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি নয় তবে বিশ্বব্যাপী আইনজীবীদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
আইনজীবীর ভূমিকা: ব্যক্তির নয়, ন্যায়বিচারের প্রতিনিধিঃ
জাতিসংঘের এই নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, একজন আইনজীবী তাঁর মক্কেলের প্রতিনিধি হলেও তিনি অপরাধ বা অপরাধীর সমর্থক নন। তিনি মূলত আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সুবিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার অংশ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি হয় যে, কোনো ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে আইনজীবী দাঁড়ালে তিনি যেন অপরাধটিকেও সমর্থন করছেন। অথচ আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো প্রত্যেক ব্যক্তি ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। আইনজীবী সেই সাংবিধানিক ও মানবাধিকারভিত্তিক নিশ্চয়তার বাহক মাত্র।
জাতিসংঘের নীতিমালার মূল বিষয়সমূহঃ
Basic Principles on the Role of Lawyers কয়েকটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করে:-
১. আইনজীবীর স্বাধীনতাঃ
আইনজীবীকে ভয়, চাপ, হুমকি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে আইনজীবীকে হয়রানি করা যাবে না।
২. মক্কেলের সঙ্গে গোপনীয় যোগাযোগের অধিকারঃ
আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যকার যোগাযোগের গোপনীয়তা ন্যায়বিচারের একটি অপরিহার্য উপাদান। এই গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে কার্যকর আইনি সহায়তা প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৩. আইনজীবীর নিরাপত্তাঃ
পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে আইনজীবী যদি হুমকি, আক্রমণ বা হয়রানির শিকার হন তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪. স্বাধীন বার অ্যাসোসিয়েশনঃ
আইনজীবীদের পেশাগত সংগঠনগুলোকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে যাতে তারা সদস্যদের অধিকার ও পেশাগত মান রক্ষা করতে পারে।
৫. সবার জন্য আইনি সহায়তাঃ
আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয় বা অভিযোগের প্রকৃতি যাই হোক না কেননপ্রত্যেক ব্যক্তির আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাঃ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি জাতিসংঘের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, আলোচিত বা আবেগপ্রবণ মামলাগুলোতে আইনজীবীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের শিকার হন। কখনও কখনও অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবীকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা হয় এমনকি তাঁর পেশাগত অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
এ ধরনের প্রবণতা শুধু একজন আইনজীবীর জন্য নয় বরং পুরো বিচারব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ আইনজীবী যদি ভয় বা জনরোষের কারণে কোনো মামলা নিতে না চান তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে।
আইনজীবীকে মক্কেলের সঙ্গে একাকার করা কি সঠিক?
জাতিসংঘের নীতিমালা স্পষ্টভাবে বলেছে, কোনো আইনজীবীকে তাঁর মক্কেলের মতামত, কর্মকাণ্ড বা অভিযোগের সঙ্গে একীভূত করে দেখা যাবে না।
একজন ডাক্তার যেমন অপরাধীর চিকিৎসা করলে অপরাধের অংশীদার হন না ঠিক তেমনি একজন আইনজীবী অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়ালেই অপরাধের সমর্থক হয়ে যান না। তাঁর দায়িত্ব হলো আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের সামনে তাঁর মক্কেলের বক্তব্য উপস্থাপন করা।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাঃ
যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে আইনজীবীর স্বাধীনতা বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধাপরাধ কিংবা গণহত্যার মামলাগুলোতেও অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য দক্ষ আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। কারণ উন্নত বিচারব্যবস্থা জানে যে, একজন ঘৃণিত অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা করাই শেষ পর্যন্ত নির্দোষ মানুষের অধিকার রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায়।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়ঃ
বাংলাদেশে জাতিসংঘের এই নীতিমালার চেতনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
* আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতার প্রতি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান বৃদ্ধি করা।
* আলোচিত মামলায় আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষমূলক প্রচারণা নিরুৎসাহিত করা।
* বার কাউন্সিল ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী করা।
* আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
* জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং আইনের শাসন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
পরিশেষে বলা যায়, ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হয় যখন তা শুধু জনপ্রিয় মানুষের জন্য নয় বরং সবচেয়ে অজনপ্রিয়, সবচেয়ে ঘৃণিত এবং সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তির জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। একজন আইনজীবীর স্বাধীনতা আসলে কোনো ব্যক্তির বিশেষ সুবিধা নয় বরং এটি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তাবলয়।
জাতিসংঘের Basic Principles on the Role of Lawyers আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন আইনজীবী কেবল একজন মক্কেলের প্রতিনিধি নন বরং তিনি ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর যে সমাজ আইনজীবীর স্বাধীনতাকে সম্মান করতে শেখে সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com