সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন আইনজীবীর একটি ঘোষণা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন কেউ যদি তাঁর চেম্বারে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আসেন তাহলে তিনি অর্ধেক ফি গ্রহণ করবেন।
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি হয়তো অনেকের কাছে মজার, ব্যতিক্রমী কিংবা সৃজনশীল প্রচারণা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একজন আইনজীবীর পেশাগত অবস্থান, আইন পেশার মর্যাদা এবং বার কাউন্সিলের নৈতিক বিধিমালার আলোকে বিষয়টি বিচার করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
আইনজীবী কি শুধুই একজন সেবাদানকারী পেশাজীবী নাকি তিনি বিচার ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ?
আইন পেশা পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশাগুলোর একটি। একজন আইনজীবী কেবল তাঁর মক্কেলের প্রতিনিধি নন বরং তিনি আদালতের একজন কর্মকর্তা (Officer of the Court)। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আইনজীবীদের জন্য বিশেষ নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত রয়েছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের Professional Conduct and Etiquette Rules-এর মূল দর্শন হলো আইনজীবী তাঁর পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখবেন। এমন কোনো কার্যক্রমে তিনি জড়াবেন না যা আইন পেশাকে সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
প্রশ্ন হলো, “আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আসলে অর্ধেক ফি” ধরনের ঘোষণা কি সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
অনেকের মতে এটি নিছক রসিকতা। কিন্তু অন্যদিকে এটিও সত্য যে এমন ঘোষণা কার্যত পেশাগত সেবাকে একটি বিপণন কৌশলে পরিণত করে। এতে আইনগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে আবেগ, খেলাধুলার সমর্থন কিংবা জনপ্রিয়তার উপাদান সামনে চলে আসে।
এখানেই মূল উদ্বেগ।
বিশ্বের বহু দেশে আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় আইনজীবীরা ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যবহুল কনটেন্ট প্রকাশ করেন এবং নিজেদের সেবার ক্ষেত্র সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞাপন ও পেশাগত মর্যাদার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে।
তথ্য প্রদান (Information) এবং প্রলোভনমূলক প্রচারণা (Solicitation) এক বিষয় নয়।
একজন আইনজীবী তাঁর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সেবার ক্ষেত্র সম্পর্কে মানুষকে জানাতে পারেন। কিন্তু এমন কোনো প্রচারণা করা সমীচীন নয় যা মানুষকে আবেগ, ছাড়, লটারি, উপহার কিংবা অন্যান্য প্রণোদনার মাধ্যমে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউব আইন সচেতনতা বৃদ্ধির শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। সাধারণ মানুষকে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানানো, আইনি জটিলতা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা কিংবা আইনি সংস্কৃতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
কিন্তু যখন আইনগত জ্ঞান প্রদানের পরিবর্তে জনপ্রিয়তা অর্জন, ভাইরাল হওয়া কিংবা ক্লায়েন্ট সংগ্রহই প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয় তখন পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আমাদের মনে রাখতে হবে আইনজীবী কোনো পণ্য বিক্রেতা নন। ন্যায়বিচারের অনুসন্ধানে সহায়তা করাই তাঁর মূল দায়িত্ব।
একই সঙ্গে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য ডিজিটাল উপস্থিতি আজ অপরিহার্য। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা যেখানে তথ্যভিত্তিক প্রচার ও পেশাগত মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে।
সবশেষে বলা যায়, একজন আইনজীবী আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা অন্য কোন দেশের সমর্থক হতে পারেন। সেটি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু যখন সেই সমর্থন পেশাগত ফি নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত হয় তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এটি কি ব্যক্তিগত রুচির প্রকাশ নাকি আইন পেশাকে অজান্তেই বাজারজাত করার একটি রূপ?
সমাজ, বার এবং আইনজীবী সকলেরই এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ আইন পেশার শক্তি জনপ্রিয়তায় নয়, আস্থায়। আর সেই আস্থার ভিত্তি হলো মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত নৈতিকতা।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com