সম্প্রতি একটি ঘটনা দেশজুড়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ নিজ ঘরে কয়েকদিন ধরে পড়ে ছিল অথচ তার সন্তানরা কেউ বিষয়টি জানতে পারেনি কিংবা খোঁজ নেয়নি। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যানুযায়ী সন্তানদের মধ্যে কেউ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
ঘটনাটি সত্যিই যদি এমন হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয় বরং এটি আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য একটি গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি? নাকি কেবল অর্থনৈতিক ও পেশাগত সাফল্যের মোড়কে মানবিক সম্পর্কগুলোকে হারিয়ে ফেলছি?
অর্থনৈতিক সাফল্য বনাম মানবিক দায়িত্বঃ
সমাজে আমরা সাধারণত মানুষের সাফল্য পরিমাপ করি তার পদ, ক্ষমতা, সম্পদ, ডিগ্রি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু একজন মানুষ কত বড় কর্মকর্তা, কত বড় শিক্ষক কিংবা কত ধনী, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো সে তার পরিবার পরিজন বিশেষ করে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করছে।
একজন মা সন্তানের জন্য জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, শ্রম ও ভালোবাসা উৎসর্গ করেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি তিনি নিঃসঙ্গতায় মৃত্যুবরণ করেন এবং দিনের পর দিন কেউ তার খোঁজ না নেয় তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় বরং এটি একটি সভ্য সমাজেরও ব্যর্থতা।
আধুনিকতার আড়ালে সম্পর্কের সংকটঃ
প্রযুক্তির যুগে যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের গভীরতা কমেছে।
আজ মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তে যোগাযোগ করতে পারে কিন্তু একই পরিবারের সদস্যরা কখনও কখনও মাসের পর মাস একে অপরের খোঁজ নেয় না।
ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা সন্তানের জীবনে আবেগের কেন্দ্র থেকে দায়িত্বের বোঝায় পরিণত হচ্ছেন।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ: আইন কী বলে?
বাংলাদেশে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শুধু নৈতিক নয় বরং আইনগতও।
বাংলাদেশঃ
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী:
* প্রত্যেক সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য।
* সন্তানরা একত্রে বা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে।
* পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্যত্র ফেলে রেখে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া আইনটির উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
* আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা এবং কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভারতঃ
ভারতের Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007 অনুযায়ী সন্তানরা পিতা-মাতার ভরণপোষণে ব্যর্থ হলে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সিঙ্গাপুরঃ
সিঙ্গাপুরে Maintenance of Parents Act অনুযায়ী আর্থিকভাবে অসচ্ছল পিতা-মাতা আদালতের মাধ্যমে সন্তানদের কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
চীনঃ
চীনে আইনগতভাবে সন্তানদের নিয়মিতভাবে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে যোগাযোগ ও খোঁজখবর রাখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। শুধু অর্থ পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
এসব আইন একটি বিষয় স্পষ্ট করে: সভ্য রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছে যে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সুরক্ষা শুধু নৈতিকতার উপর ছেড়ে দিলে সবসময় যথেষ্ট হয় না বরং আইনকেও ভূমিকা রাখতে হয়।
সমাজ কি দায়মুক্ত?
এই ঘটনায় কেবল সন্তানদের দায় দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। সন্তানদের দায় এর বাইরেও আরো কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়:-
প্রতিবেশী কোথায় ছিল?
আত্মীয়স্বজন কোথায় ছিল?
স্থানীয় সমাজ কোথায় ছিল?
একসময় গ্রামবাংলায় একজন মানুষ কয়েকদিন দেখা না গেলে প্রতিবেশীরা খোঁজ নিত। আজ আমরা একই ভবনে বসবাস করেও অনেক সময় পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবর জানি না।
ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা যত বাড়ছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা তত কমছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ
প্রায় সব ধর্মেই পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বকে সর্বোচ্চ নৈতিক কর্তব্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে আল্লাহর ইবাদতের পরেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বারবার পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, দয়া ও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ এসেছে।
কেবল আর্থিক সহায়তা নয় বরং তাদের মানসিক সঙ্গ, সম্মান ও যত্নও সন্তানের দায়িত্বের অংশ।
পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা: দায়িত্ব শুধু সন্তানের নয়, পিতা-মাতারওঃ
এই ধরনের ঘটনার আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়শই সন্তানদের দায়িত্ব ও ব্যর্থতার কথা বলি। কিন্তু বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। সন্তানদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার দায়িত্বও মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়।
একটি শিশু জন্মগতভাবে দায়িত্বশীল বা দায়িত্বহীন হয়ে জন্মায় না। সে পরিবার, পরিবেশ এবং শিক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার মূল্যবোধ গড়ে তোলে। যদি ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে শেখানো হয় যে পিতা-মাতা শুধু ভরণপোষণের দায়িত্ব পালনকারী নন বরং সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার দাবিদার। তাহলে সেই শিক্ষা তার সারাজীবনের আচরণে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
অনেক সময় দেখা যায় পিতা-মাতা সন্তানের শিক্ষাগত সাফল্য, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা এবং পেশাগত উন্নতির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন কিন্তু নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলস্বরূপ, সমাজে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয় যারা পেশাগতভাবে অত্যন্ত সফল কিন্তু পারিবারিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনে দুর্বল।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ঘটনায় দায় পিতা-মাতার উপর বর্তায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার নিজের কাজের জন্য নিজেই দায়ী। তবে এটাও সত্য যে পরিবারই একজন মানুষের প্রথম বিদ্যালয় এবং পিতা-মাতাই তার প্রথম শিক্ষক।
সুতরাং এই সংকটের সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ বা সামাজিক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন এমন একটি পারিবারিক সংস্কৃতি যেখানে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হবে:
* পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা,
* নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া,
* পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের পাশে থাকা,
* এবং মানবিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সাফল্যের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে না করা।
কারণ একটি সমাজ তখনই সুস্থ ও মানবিক হয়ে ওঠে যখন সেখানে শুধু সফল মানুষ নয় বরং দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি হয়।
হয়তো সেদিনই আমরা এমন হৃদয়বিদারক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কম দেখতে পাব যখন সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি মানবিকতাতেও সমানভাবে সমৃদ্ধ হবে এবং পিতা-মাতারাও ছোটবেলা থেকেই সেই মূল্যবোধের বীজ তাদের হৃদয়ে রোপণ করবেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায়ঃ
১. পরিবারে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ।
২. সন্তানদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা।
৩. পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।
৪. একাকী বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৫. প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
৬. সমাজে প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া।
৭. রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রবীণ সুরক্ষা নীতিমালা আরও শক্তিশালী করা।
পরিশেষে বলতে পারি, একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য তার পদবী, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা দিয়ে নয় বরং সে তার দায়িত্বগুলো কতটা মানবিকভাবে পালন করেছে তা দিয়ে পরিমাপ করা।
যে সমাজে একজন মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এবং দিনের পর দিন কেউ তার খোঁজ নেয় না সেখানে শুধু একটি পরিবার নয় বরং পুরো সমাজেরই আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
আমরা হয়তো উন্নত ভবন নির্মাণ করেছি, প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছি কিন্তু যদি আমাদের মা-বাবারা শেষ বয়সে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও বিস্মৃতির শিকার হন তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সকলকেই খুঁজতে হবে।
কারণ সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয় বরং দুর্বল, অসহায় ও বৃদ্ধ মানুষদের প্রতি আমাদের আচরণ, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধও।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com