একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন তখনই কার্যকর হয় যখন আইনজীবীরা ভয়ভীতি ও চাপমুক্তভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কারণ একজন আইনজীবী শুধু একজন মক্কেলের প্রতিনিধি নন বরং তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু সময় আইনজীবীদের হুমকি, হামলা, নির্যাতন এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটেছে যা বিচারব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের আইনের আশ্রয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যদি একজন আইনজীবীই নিরাপদ না থাকেন তাহলে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে আইনজীবীদের উপর হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে নির্যাতন এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের ঘটনা ঘটেছে। আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয় বরং এটি আইন পেশার নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। একজন আইনজীবী যদি তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় জীবনহানির ঝুঁকিতে থাকেন তাহলে তা পুরো বিচারব্যবস্থার জন্যই অশনিসংকেত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইনজীবীদের সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে “Basic Principles on the Role of Lawyers” গ্রহণ করে যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আইনজীবীরা যেন ভয়, হুমকি, হয়রানি বা অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কোনো আইনজীবী তার মক্কেলের পক্ষে দায়িত্ব পালনের কারণে হুমকি বা নির্যাতনের শিকার হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে কার্যকর সুরক্ষা প্রদান করা।
উন্নত বিশ্বের বহু দেশে এই নীতিগুলো বাস্তবভাবে প্রয়োগ করা হয়।
🇬🇧 যুক্তরাজ্যে আইনজীবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকারকে Rule of Law-এর মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে হুমকি বা সহিংসতার অভিযোগ এলে দ্রুত তদন্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে আইনজীবীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং federal পর্যায়ে নিরাপত্তা কাঠামো বিদ্যমান।
🇨🇦 কানাডায় Bar Association ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাজ করে।
বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে একটি কার্যকর “আইনজীবী সুরক্ষা আইন” প্রণয়নের। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না সাথে এর বাস্তব ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
• আইনজীবীদের উপর হামলা, হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ ফৌজদারি বিধান প্রণয়ন।
• আদালত প্রাঙ্গণ ও বার ভবনে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, CCTV ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ।
• স্পর্শকাতর মামলায় নিয়োজিত আইনজীবীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সহায়তা ও দ্রুত পুলিশি সুরক্ষা।
• আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল হয়রানি, অপপ্রচার ও cyber harassment প্রতিরোধে বিশেষ সেল গঠন।
• আইনজীবী নির্যাতন বা হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা Fast Track ব্যবস্থা চালু।
• বার কাউন্সিল ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া।
• বিচারপ্রক্রিয়ায় জড়িত সকল পক্ষের মধ্যে পেশাগত সম্মান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
কারণ একজন আইনজীবীর নিরাপত্তা শুধু একটি পেশার নিরাপত্তা নয়, এটি ন্যায়বিচার, বিচারব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেই হবে।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com