আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার: ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি নাকি বিতর্কের কেন্দ্র?

Right to Counsel May 22, 2026 Barrister Md Sohrawardy Saddam
আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার: ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি নাকি বিতর্কের কেন্দ্র?

বর্বরোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমন নির্মম ঘটনার পর মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও দ্রুত শাস্তির দাবি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে যত বড় বা ঘৃণ্য অপরাধই হোক না কেন একজন অভিযুক্ত কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে?

আইনের ভাষায় উত্তর হলো, “হ্যাঁ”।

কারণ একটি সভ্য বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো fair trial বা ন্যায়সঙ্গত বিচার। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষ করে Universal Declaration of Human Rights (UDHR) এবং International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এও fair trial মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।

আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিলে কী জটিলতা তৈরি হতে পারে?

যদি কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বিচার করা হয় তাহলে বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

কারণ:

* ভুল ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে

* তদন্তের ত্রুটি সামনে আসার সুযোগ কমে যায়

* রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে আইন অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়

* মিথ্যা মামলা বা সাজানো অভিযোগের ভয় বাড়ে

* বিচারব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা কমে যায়

ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে যেখানে জনরোষ বা আবেগের কারণে নিরপরাধ মানুষ শাস্তির শিকার হয়েছে। পরে প্রমাণ হয়েছে প্রকৃত অপরাধী অন্য কেউ ছিল।

আইনজীবী নিয়োগ করা কি অভিযুক্তের অধিকার?

অবশ্যই। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় অপরাধের অভিযোগেই অভিযুক্ত হোক না কেন তার আইনজীবী পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি অপরাধীকে “সমর্থন” করা নয় বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।

অনেক সময় মানুষ ভুলভাবে মনে করে “অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ানো মানে অপরাধকে সমর্থন করা।” বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। একজন আইনজীবীর দায়িত্ব হলো:

* আইনি প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ হচ্ছে কিনা নিশ্চিত করা

* অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা

* আদালতের সামনে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা

কারণ আদালত আবেগ দিয়ে নয় প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে বিচার করে।

অপরাধীর পক্ষে কেউ না দাঁড়ালে কী হতে পারে?

যদি কোনো ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে না চান তাহলে ভুল বিচার হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কারণ:

* একতরফা বিচার হতে পারে

* তদন্তের অসঙ্গতি সামনে নাও আসতে পারে

* জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি বা fabricated evidence প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ কমে যায়

* ভবিষ্যতে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধে ব্যবহার করার পথ তৈরি হতে পারে

একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থায় আদালতকে অবশ্যই উভয় পক্ষের কথা শুনতে হয়। এটিই natural justice-এর মূলনীতি।

আবেগ দিয়ে বিচার হলে কী সমস্যা হতে পারে?

রামিসার মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডে মানুষের আবেগ কাজ করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিচারব্যবস্থায় যদি আবেগ প্রাধান্য পায় তাহলে আইন ধীরে ধীরে mob justice বা জনরোষনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

তখন:

* সামাজিক চাপের কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে

* মিডিয়া ট্রায়াল শুরু হতে পারে

* আদালতের উপর জনচাপ তৈরি হতে পারে

* নিরপরাধ ব্যক্তি ফাঁসার ঝুঁকি বাড়ে

ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আদালত আবেগ নয় প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত দেয়।

তবে এটাও সত্য: ন্যায়বিচারের দোহাই দিয়ে বিচার বিলম্বিত হওয়া উচিত নয়ঃ

আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এটাও খেয়াল রাখতে হবে যাতে “fair trial” বা ন্যায়বিচারের নামে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি না হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়:

* মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ে

* তদন্ত দীর্ঘ হয়

* সাক্ষ্যগ্রহণ বিলম্বিত হয়

* আইনি কৌশলে বিচার পিছিয়ে যায়

ফলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীও আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এটি বিচারব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ “Justice delayed is justice denied” বিলম্বিত বিচারও এক ধরনের অবিচার।

তাই প্রয়োজন:

* দ্রুত কিন্তু fair trial

* দক্ষ তদন্ত

* নিরপেক্ষ prosecution

* অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ বন্ধ করা

* এবং সংবেদনশীল মামলাগুলোতে Fast Track বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা

ন্যায়বিচার মানে শুধু অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা নয় বরং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও।

উন্নত বিশ্বের বিচারব্যবস্থার উদাহরণঃ

🇬🇧 যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনজীবী পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়। তবে একইসঙ্গে দ্রুত তদন্ত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রে “Right to Counsel” একটি সাংবিধানিক অধিকার। অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনজীবী বহন করতে না পারলেও রাষ্ট্র তার জন্য আইনজীবীর ব্যবস্থা করে। তবে গুরুতর অপরাধে speedy trial-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতি।

🇨🇦 কানাডা ও 🇯🇵 জাপানেও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। একইসঙ্গে বিচার দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে আদালত কঠোর case management অনুসরণ করে।

উত্তরণের উপায়ঃ

✔ দ্রুত কিন্তু fair trial নিশ্চিত করা

✔ তদন্তকে রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপমুক্ত রাখা

✔ মিডিয়া ট্রায়াল ও গুজব নিয়ন্ত্রণ করা

✔ সাক্ষী ও প্রমাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা

✔ জনগণের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করা

✔ বিচারব্যবস্থাকে আবেগ নয় বরং আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত করা

✔ সংবেদনশীল মামলায় Fast Track Tribunal কার্যকর করা

পরিশেষে বলতে পারি রামিসার জন্য বিচার অবশ্যই হতে হবে এবং সেটি হতে হবে দ্রুত, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু সেই বিচার অবশ্যই আইনের কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। 

কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয় বরং এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে যেখানে সবচেয়ে ঘৃণিত অভিযুক্তও ন্যায়সঙ্গত বিচার পায় আবার কোনো আইনি দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রকৃত অপরাধীও যেন পার পেয়ে যেতে না পারে।

ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায় যখন আদালত আবেগ নয় বরং সত্য, প্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত দেয়।

Barrister Md Sohrawardy Saddam 

Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)

LLB Hons (BIU), LLM (SEU)

2nd LLM on International Commercial Law

London South Bank University, UK.

Founder: Saddam Lawfinity Chambers

Email: saddamlawfinity@gmail.com

Web: www.saddamlawfinity.com

Article link copied to clipboard!