বাংলাদেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে মাসদার হোসেন মামলা-এর রায়ের পর থেকে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে আবার প্রশ্ন উঠেছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচার বিভাগকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা কতটা যৌক্তিক?
এই প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক নয় এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের ভবিষ্যতের সাথেও জড়িত।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পটভূমি
বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয় কার্যত নির্বাহী বিভাগের প্রভাবাধীন ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ে আপিল বিভাগ কয়েকটি মৌলিক নির্দেশনা দেয়। এর মূল কথা ছিল:
* বিচার বিভাগকে বাস্তবিক অর্থে স্বাধীন করা
* নিম্ন আদালতকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখা
* বিচারকদের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা
* আলাদা জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন করা
এই রায়ের ধারাবাহিকতায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকর হয় এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ধারণা শক্তিশালী হয়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় মূলত বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি কাঠামো। এর মাধ্যমে আদালত নিজস্ব জনবল, বাজেট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় অধিক স্বায়ত্তশাসন পায়।
এটি প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল দর্শন ছিল:
“যে বিভাগ বিচার করবে, তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও তার নিজের হাতে থাকা উচিত।”
কারণ বিচার বিভাগ যদি নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল থাকে তাহলে ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি
এই ধারণার পক্ষেও কিছু যুক্তি রয়েছে। সেগুলো একেবারে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
১. প্রশাসনিক সমন্বয় সহজ হতে পারে
একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে বাজেট, নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আর্থিক অনুমোদন দ্রুত হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
২. ব্যয় কমানোর যুক্তি
আলাদা সচিবালয় মানে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো, জনবল এবং ব্যয়। সরকার চাইলে এটিকে “ডুপ্লিকেশন” হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
৩. জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
কেউ কেউ যুক্তি দেন সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা বা স্বজনপ্রীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মন্ত্রণালয়ের তদারকি থাকলে জবাবদিহিতা বাড়তে পারে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো: এতে কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? এখানেই মূল বিতর্ক।
১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি
বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যদি নির্বাহী বিভাগের হাতে যায়, তাহলে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বাড়তে পারে।
ন্যায়বিচারের মূল শর্তই হলো বিচারকের স্বাধীনতা।
২. সংবিধানের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ এবং মাসদার হোসেন মামলার মূল দর্শন ছিল বিচার বিভাগকে আলাদা ও স্বাধীন করা। পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সেই অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে।
৩. জনগণের আস্থা কমতে পারে
মানুষ আদালতে যায় শেষ আশ্রয় হিসেবে। যদি জনগণের মনে হয় আদালত প্রশাসনিকভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল তাহলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৪. ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা
গণতন্ত্রে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখে। বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবে নির্বাহী বিভাগের অধীনে গেলে সেই ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে।
উন্নত বিশ্বের উদাহরণ
যুক্তরাষ্ট্রঃ যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগ অত্যন্ত স্বাধীন। Supreme Court of the United States নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। নির্বাহী বিভাগ সরাসরি আদালতের প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে না।
যুক্তরাজ্যঃ যুক্তরাজ্যে ঐতিহাসিকভাবে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থাকলেও ধীরে ধীরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করা হয়েছে। Supreme Court of the United Kingdom আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়।
ভারতঃ ভারতের Supreme Court of India প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও বিচারকদের নিয়োগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। নির্বাহী বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
কানাডাঃ কানাডাতেও আদালতের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিচার বিভাগকে প্রশাসনিকভাবে নিরপেক্ষ রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তাহলে সমাধান কী?
সমস্যা থাকলে সংস্কার হতে পারে। কিন্তু সমাধান হওয়া উচিত স্বাধীনতা নষ্ট করে নয় বরং যেসব বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে:
* সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
* প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
* বাজেট ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ
* বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ধীরগতি কমানো
* প্রযুক্তিনির্ভর বিচার প্রশাসন গড়ে তোলা
অর্থাৎ, “স্বাধীনতা” এবং “জবাবদিহিতা” দুটোই একসাথে নিশ্চিত করতে হবে।
সুতরাং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয় এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে সংস্কারের প্রয়োজনও থাকতে পারে। কিন্তু সেটি বিলুপ্ত করে বিচার বিভাগকে পুনরায় নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন আদালত শুধু স্বাধীন নয় বরং স্বাধীন বলে জনগণের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হয়। আর সেই বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সংবিধান কাগজে থাকে বাস্তবে নয়।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com