বাংলাদেশে আবারও হাম (Measles) রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ পুনরায় ফিরে আসা শুধু স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাই নয় বরং আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। অথচ সময়মতো টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগ প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতির জন্য দায় কার?
বাস্তবতা হলো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কখনোই একদিনে তৈরি হয় না। এটি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়া, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতির ফল। তাই পুরো দায় কোনো একটি পক্ষের উপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে অন্তর্বর্তী সরকারও দায় এড়াতে পারে না।
একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সীমিত হতে পারে কিন্তু জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা তাদের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিশেষ করে:
• টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখা
• পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা
• আক্রান্ত এলাকায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ
• স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয় বৃদ্ধি
• গুজব ও ভুল তথ্য প্রতিরোধে কার্যকর প্রচারণা চালানো
এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ ও ১৮ অনুযায়ী রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধ্য। এছাড়া সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ সরকারকে প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা ও দায়িত্ব দুটোই দিয়েছে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ২৬৯ ও ২৭০ অনুযায়ী অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে সংক্রামক রোগ বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে জনস্বাস্থ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
🇬🇧 যুক্তরাজ্যে টিকাদান কাভারেজ কমে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ ক্যাম্পেইন ও স্থানীয় স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়।
🇦🇺 অস্ট্রেলিয়ায় “No Jab, No Pay” নীতির মাধ্যমে টিকাদানে উৎসাহ দেওয়া হয়।
🇸🇬 সিঙ্গাপুরে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দ্রুত ট্র্যাকিং ও কঠোর স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশেও এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয় বরং সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ।
✔️ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজলভ্য টিকাদান নিশ্চিত করা
✔️ টিকা নিয়ে গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি
✔️ ডিজিটাল টিকা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা
✔️ স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদার করা
✔️ স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা ও পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করা
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট জনস্বাস্থ্য কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয় এটি একটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরায় বিস্তার আমাদের শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাই দেখায় না বরং সচেতনতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতিকেও সামনে নিয়ে আসে।
একটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি জীবনকে সুরক্ষা দেওয়া নয় বরং পুরো সমাজকে নিরাপদ রাখা। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয় বরং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা।
কারণ একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার উন্নয়ন বা অবকাঠামো দিয়ে নয় বরং সংকটের সময় মানুষের জীবন রক্ষায় তার কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB Hons (BIU), LLM (SEU)
2nd LLM on International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: saddamlawfinity@gmail.com
Web: www.saddamlawfinity.com