ছয়জন নবজাতক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি এবং রাষ্ট্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমন ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন।

কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ জনমনে ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে পুরো আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা কতটা ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত এবং জনস্বার্থসম্মত?

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতের বাস্তবতা কারও অজানা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে পরিচালিত অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বছরের পর বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়া কিংবা ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ না করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসক, ভুল চিকিৎসা, অপারেশন থিয়েটারে অব্যবস্থাপনা, নকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

একই সঙ্গে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। রোগীর তুলনায় শয্যার স্বল্পতা, চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব, অব্যবস্থাপনা, দালালচক্র এবং চিকিৎসাসেবার নিম্নমান প্রায়শই জনসাধারণের অভিযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এসব কাঠামোগত সমস্যার জন্য খুব কম ক্ষেত্রেই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের নজির দেখা যায়।

সেখানে আদ-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি প্রতিষ্ঠান যা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল হিসেবে কাজ করেছে তার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো সমতা (Equality Before Law)। একই ধরনের অপরাধ বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগও সমান হওয়া উচিত। যদি দেশের শত শত অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠান বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে তাহলে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই দেখাতে হবে যে সিদ্ধান্তটি প্রমাণভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।

আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো “Proportionality” বা শাস্তির অনুপাতিকতা। অর্থাৎ অপরাধের প্রকৃতি এবং শাস্তির মাত্রার মধ্যে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে।

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবহেলার কারণে এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি, দেওয়ানি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ফলে যে বৃহত্তর জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটলেও সাধারণত ধাপে ধাপে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যুক্তরাজ্যে Care Quality Commission (CQC) হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করে, বিশেষ তদারকি আরোপ করে, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়, জরিমানা করে কিংবা নির্দিষ্ট বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রেও চিকিৎসাগত অবহেলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু একটি হাসপাতাল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া সাধারণত সর্বশেষ এবং ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কারণ উন্নত বিশ্ব বুঝে যে একটি হাসপাতাল কেবল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি একটি সামাজিক অবকাঠামো যার সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবন ও চিকিৎসার অধিকার জড়িত।

আদ-দ্বীনের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই কেবল প্রশাসনিক নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণে শাস্তি দেওয়া হয় তবে সেই শাস্তি এমন হওয়া উচিত যা দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনে কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোই বিপজ্জনকভাবে ব্যর্থ ছিল তাহলে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু যদি দায় সীমাবদ্ধ থাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বিভাগ বা ব্যবস্থাপনার একটি অংশের মধ্যে তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকা উচিত।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল শাস্তি দেওয়া নয় বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আর ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন আইনের প্রয়োগ হয় সমানভাবে, বৈষম্যহীনভাবে এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।

আজ তাই প্রশ্নটি শুধু আদ-দ্বীন হাসপাতালকে ঘিরে নয় বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা কি স্বাস্থ্যখাতে সবার জন্য সমান জবাবদিহিতা চাই নাকি নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোরতা প্রদর্শন করে সমস্যার মূল কারণগুলোকে আড়াল করতে চাই?

কারণ আইনের শাসনের প্রকৃত শক্তি শাস্তির কঠোরতায় নয় বরং তার ন্যায়সংগত, নিরপেক্ষ এবং সমান প্রয়োগে নিহিত।

Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (Lincoln’s Inn)
LLB (Hons), LLM International Commercial Law
London South Bank University, UK

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *